গ্রামের গণ্ডি পেরিয়ে আইএএস অফিসার! প্রথম চেষ্টাতেই বাজিমাত করলেন সুলোচনা মীনা

ইউপিএসসি (UPSC) বা সিভিল সার্ভিস পরীক্ষা—ভারতের কোটি কোটি শিক্ষার্থীর কাছে এটি কেবল একটি পরীক্ষা নয়, বরং এক আরাধ্য স্বপ্ন। বছরের পর বছর কঠোর পরিশ্রম করেও অনেকে যেখানে লক্ষ্যভেদে ব্যর্থ হন, সেখানে প্রথম চেষ্টাতেই সফল হয়ে চমক সৃষ্টি করেছেন রাজস্থানের সুলোচনা মীনা। মাত্র ২২ বছর বয়সে দেশের অন্যতম কঠিন এই পরীক্ষায় শুধু উত্তীর্ণই হননি, বরং নিজের মেধার পরিচয় দিয়ে আইএএস অফিসার হিসেবেও নাম লিখিয়েছেন তিনি।

রাজস্থানের সাওয়াই মাধোপুর জেলার ছোট্ট গ্রাম আদালওয়ারা থেকে উঠে আসা সুলোচনার এই যাত্রা অনেকের জন্যই অনুপ্রেরণা। তিনি বর্তমান ঝাড়খণ্ড ক্যাডারের একজন আইএএস অফিসার। ২০২১ সালে প্রথমবার ইউপিএসসি পরীক্ষায় বসে ২০২২ সালে তিনি যখন চূড়ান্ত সাফল্য পান, তখন পুরো দেশ তাঁর সাফল্যের গল্পে বিস্মিত হয়েছিল। সর্বভারতীয় পর্যায়ে ৪১৫তম এবং এসটি (তফসিলি উপজাতি) বিভাগে ষষ্ঠ স্থান অর্জন করে তিনি প্রমাণ করেছেন, ইচ্ছাশক্তি থাকলে প্রতিকূলতা কখনো বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না।

সুলোচনার পরিবার এবং তাঁর বেড়ে ওঠার গল্পটি অত্যন্ত সংগ্রামের। তাঁর বাবা একজন কৃষক। সীমিত আয়ে কোনোমতে সংসার চললেও সুলোচনার পড়াশোনায় বাবা-মা কখনো বাধা দেননি। তবে গ্রাম্য সমাজের মানসিকতা ছিল সম্পূর্ণ বিপরীত। যখনই সুলোচনা বড় কোনো লক্ষ্য বা আইএএস হওয়ার স্বপ্নের কথা বলত, প্রতিবেশীরা উপহাস করে বলত, “মেয়ে মানুষ, এত পড়াশোনা করে কী হবে? তার চেয়ে বিয়ে দিয়ে দেওয়াই ভালো।” কিন্তু চারপাশের সেই নেতিবাচক মন্তব্য সুলোচনাকে ভেঙে ফেলার পরিবর্তে আরও দৃঢ় প্রতিজ্ঞ করে তুলেছিল।

দ্বাদশ শ্রেণিতে সুলোচনার ঈর্ষণীয় ফলাফল তাঁর বাবার মনে আশা জাগিয়েছিল। মেয়ের স্বপ্নকে সম্মান জানিয়ে চরম অভাবের মধ্যেও বাবা তাঁকে উচ্চশিক্ষার জন্য দিল্লিতে পাঠান। দিল্লিতে গিয়েও সুলোচনা বুঝতে পেরেছিল যে, বড় কোনো কোচিং সেন্টারে ভর্তি হওয়ার মতো আর্থিক সামর্থ্য তাঁর নেই। কিন্তু হাল না ছেড়ে তিনি নিজেই প্রস্তুতির হাল ধরেন।

নিজের সাফল্যের মন্ত্র হিসেবে সুলোচনা জানান, কলেজ জীবনের একদম শেষ দিকে তিনি ইউপিএসসির প্রস্তুতির জন্য নিজেকে নিংড়ে দিয়েছিলেন। তাঁর পড়াশোনার রুটিন ছিল অত্যন্ত সুশৃঙ্খল। প্রতিদিন অন্তত ৮-৯ ঘণ্টা মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা করতেন তিনি। বিশেষ করে সংবাদপত্র পড়া এবং সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহের (Current Affairs) ওপর গভীর নজর রাখা—এটিকে তিনি প্রস্তুতির অবিচ্ছেদ্য অংশ বলে মনে করেন। সংবাদপত্রের গুরুত্ব দিয়ে তিনি ৫-৬ ঘণ্টা সময় শুধু তথ্য সংগ্রহের জন্য ব্যয় করতেন।

সুলোচনার এই সাফল্য কেবল তাঁর ব্যক্তিগত জয় নয়, এটি গ্রামের সেই সকল মেয়েদের জন্য এক মস্ত বড় উদাহরণ যারা সামাজিক চাপে নিজের স্বপ্ন বিসর্জন দেয়। নিজের জেলায় সর্বকনিষ্ঠ এবং গ্রামের প্রথম আইএএস অফিসার হিসেবে সুলোচনা আজ নতুন প্রজন্মের কাছে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। ধৈর্য এবং একাগ্রতা বজায় থাকলে যে কোনো সাধারণ ঘরের মেয়েও দেশের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক পদে বসতে পারে, তা সুলোচনা মীনা আজ প্রমাণ করে দেখিয়েছেন।