তৃণমূল জমানায় টলিপাড়ার ‘অঘোষিত অধিপতি’ হিসেবে পরিচিত বিশ্বাস ব্রাদার্স—অর্থাৎ অরূপ বিশ্বাস ও স্বরূপ বিশ্বাসের সাম্রাজ্যে ধস নেমেছে। রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গেই টলিপাড়ার অন্দরে জমে থাকা ক্ষোভ আগ্নেয়গিরির মতো ফেটে পড়েছে। এরই মধ্যে প্রাক্তন মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাসের অস্বস্তি বাড়িয়ে দিয়ে তাঁর ভাই স্বরূপ বিশ্বাসকে আটক করল পুলিশ। পুলিশি অভিযানে উঠে এল একগুচ্ছ চাঞ্চল্যকর তথ্য।
মঙ্গলবার বেহালার সাহাপুর কলোনিতে বিশ্বাস ব্রাদার্স-এর ফ্ল্যাটে হানা দেয় বিশাল পুলিশ বাহিনী। সাহাপুর কলোনির ৩ এবং ৪ তলায় অবস্থিত দুটি ফ্ল্যাটে দুপুর ১২টা থেকে শুরু হয় দীর্ঘ তল্লাশি। তল্লাশির সময় একটি রুমের সন্ধান পান তদন্তকারীরা, যা ছিল ডিজিটাল লকে সুরক্ষিত। রহস্যভেদে পুলিশ চাবি ভাঙার কারিগর ও কাঠমিস্ত্রি ডাকতে বাধ্য হয়। সেই দরজা খুলতেই চক্ষু চড়কগাছ তদন্তকারীদের! উদ্ধার হয়েছে বিপুল পরিমাণ নথিপত্র এবং অত্যাধুনিক ইলেকট্রনিক গ্যাজেট। এর মধ্যে রয়েছে ১৪টি সচল মোবাইল ফোন ও ২টি আইপ্যাড। প্রাথমিক তদন্তের পর পুলিশ নিশ্চিত যে, এই নথিপত্রগুলি মূলত ফেডারেশন বা গিল্ড সংক্রান্ত দুর্নীতি বা অনিয়মের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
ভোটে বিজেপির উত্থানের পর থেকেই টলিপাড়ার সমীকরণ আমূল বদলে গিয়েছে। এতদিন ভয়ের চোটে যারা মুখ খোলার সাহস পাননি, সেই টেকনিশিয়ান থেকে শুরু করে বড় বড় তারকারা এখন একের পর এক অভিযোগের ঝুলি খুলে বসছেন। এতদিন বিশ্বাস ব্রাদার্সের দাপটে ইন্ডাস্ট্রি কার্যত স্তব্ধ ছিল। অভিযোগ, সরকারি ক্ষমতার অপব্যবহার করে টলিউডের সমস্ত সিদ্ধান্ত তারা নিজেদের ইচ্ছামতো নিয়ন্ত্রণ করত। এমনকি ফেডারেশনের ওপর তাদের একাধিপত্য নিয়ে শিল্পীদের মনে ছিল চরম ক্ষোভ।
স্বরূপ বিশ্বাসকে আটকের পর পুলিশ তাঁকে সঙ্গে নিয়ে টালিগঞ্জের টেকনিশিয়ান স্টুডিওতে হানা দেয়। এরপর নিউ আলিপুর ও বেহালার ফ্ল্যাটেও চলে দীর্ঘ ম্যারাথন তল্লাশি। অরূপ বিশ্বাস বর্তমানে কোথায় আছেন, তা নিয়ে ধোঁয়াশা অব্যাহত। কেউ বলছেন তিনি পলাতক, আবার কারো দাবি, তিনি তদন্তে সহযোগিতা করছেন না। যদিও তৃণমূলের এই প্রভাবশালী নেতা সম্পর্কে সরকারিভাবে কোনো বিবৃতি মেলেনি, তবে তাঁর রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত জীবন এখন চূড়ান্ত বিপর্যয়ের মুখে।
তদন্তকারী কর্মকর্তাদের মতে, উদ্ধার হওয়া ডিজিটাল গ্যাজেট ও নথিগুলি থেকে টলিউডের আর্থিক দুর্নীতির এক বিশাল নেটওয়ার্কের হদিস পাওয়া সম্ভব। স্বরূপ বিশ্বাসকে জেরা করে অরূপ বিশ্বাসের ভূমিকা সম্পর্কেও একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সূত্র পাওয়ার চেষ্টা করছেন তদন্তকারীরা। শাসকদলের ক্ষমতার দাপটে এতদিন যে দুর্নীতির কালো মেঘ টলিপাড়ায় চেপে ছিল, আজকের এই পুলিশি অভিযানের পর তা পরিষ্কার হতে শুরু করেছে। শহরজুড়ে এখন একটাই প্রশ্ন— বিশ্বাস ব্রাদার্সের এই ‘গোপন সাম্রাজ্য’-এর শেষ কোথায়?





