জলদি ঘুমোনোই সাফল্যের চাবিকাঠি নয়! আপনার দেহঘড়িই আসল রহস্য

ছোটবেলা থেকে আমরা শুনে এসেছি, তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে ওঠা নাকি সুস্থ, ধনী ও জ্ঞানী হওয়ার মূল মন্ত্র। কিন্তু এই প্রবাদ কি সত্যিই সকলের জন্য প্রযোজ্য? নাকি ব্যক্তিভেদে এর ব্যতিক্রমও রয়েছে? বিজ্ঞান কিন্তু অন্য কথা বলছে।
মানবদেহে একটি সহজাত জৈবিক ঘড়ি বিদ্যমান, যা জিনগতভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়। একেই দেহঘড়ি বা সার্কেডিয়ান রিদম বলা হয়। এই ঘড়ির উপর ভিত্তি করেই দিনের বিভিন্ন সময়ে ব্যক্তির বিপাক ক্রিয়া ভিন্ন ভিন্ন মাত্রায় সক্রিয় থাকে।
আশ্চর্যজনক হলেও সত্যি, বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩৯ শতাংশ মানুষের বিপাক ক্রিয়া সন্ধ্যায় অপেক্ষাকৃত বেশি সক্রিয় থাকে। তবে তারা প্রচলিত সময়সূচি অনুসরণ করতে বাধ্য হন, যা তাদের উৎপাদনশীলতার বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেহঘড়ি অনুসারে নিজের জীবনযাত্রাকে মানিয়ে নিতে পারলে তা স্বাস্থ্য ও জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের পাশাপাশি উৎপাদনশীলতা বাড়াতেও সহায়ক হতে পারে। মার্ক জুকারবার্গ বা এলন মাস্কের মতো বহু সফল ব্যক্তি দাবি করেন যে তারা ‘সকালের মানুষ’ নন। তা সত্ত্বেও তারা তাদের অসাধারণ সাফল্যের মাধ্যমে বিশ্বকে বদলে দিয়েছেন। আসুন, বিপাক ক্রিয়া এবং স্বাস্থ্যের পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জেনে নেওয়া যাক:
শরীরচর্চার সঠিক সময়: এই অতিমারীর সময়ে সুস্থ থাকা আগের চেয়েও বেশি জরুরি। শরীরচর্চার অভ্যাস আমাদের একটি নির্দিষ্ট রুটিনে বাঁধতে সাহায্য করে। তবে শরীরচর্চার জন্য আমরা যে সময়টি বেছে নিই, তার উপর ব্যায়ামের ফলাফল ও তীব্রতা অনেকাংশে নির্ভর করে। যাদের বিপাক ক্রিয়া বিকেলে বেশি সক্রিয় থাকে, তাদের জন্য বিকেলে শরীরচর্চা করাই সর্বোত্তম।
খাবার গ্রহণের সময়: আমরা কী খাচ্ছি শুধু সেটাই নয়, কখন খাচ্ছি সেটিও স্বাস্থ্যকর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠিগুলির মধ্যে অন্যতম। আমাদের দৈনন্দিন খাদ্যাভ্যাসে শর্করা জাতীয় খাবার কোনো না কোনোভাবে অন্তর্ভুক্ত থাকে। দেহের প্রয়োজনীয় শক্তির অন্যতম প্রধান উৎস হল এই শর্করা। তবে এই শর্করাকে প্রক্রিয়াজাত করতে দেহের সক্রিয় বিপাকের প্রয়োজন। অন্যথায়, এই শর্করা শরীরে চর্বি হিসেবে জমা হয়ে ওজন বৃদ্ধি করে। তাই দিনের কোন সময়ে ভারী খাবার গ্রহণ করবেন, তা মূলত আপনার বিপাক ক্রিয়ার উপর ভিত্তি করে নির্ধারণ করা উচিত।
পেশাদার কাজের সেরা সময়: আমরা সকলেই সাধারণত নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে কাজ করে থাকি। এমন কিছু কাজ থাকে যা সর্বোচ্চ মনোযোগ বা নিখুঁতভাবে করার দাবি রাখে। এই ধরনের কাজগুলি প্রাথমিকভাবে ব্যক্তির উৎপাদনশীলতার সময়ের উপর ভিত্তি করে পরিকল্পনা করা যেতে পারে। সকাল বা সন্ধ্যা যে সময়ই হোক না কেন, ব্যক্তির দক্ষতা ও কর্মক্ষমতা বিকাশের জন্য তার সর্বোচ্চ কর্মক্ষম সময়টি বেছে নেওয়া উচিত। আপনার দেহ যখন সবচেয়ে বেশি সক্রিয় থাকে, তখন আপনি স্বাভাবিকভাবেই দক্ষতার সঙ্গে কাজ করতে সক্ষম হবেন।
অধ্যয়নের উপযুক্ত সময়: আমরা সাধারণত দুই ধরনের শিক্ষার্থী দেখতে পাই – একদল খুব সকালে উঠে পড়াশোনা করতে পছন্দ করে, অন্যদল রাত জেগে। এর মধ্যে কোনো ভুল নেই, যদি আপনার দেহ এর সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারে। তবে অনেক সময় এই পছন্দের কারণ বাহ্যিক পরিস্থিতির উপর নির্ভরশীল হয়। শরীর বুঝে বা শরীরের চাহিদা অনুসারে পড়াশোনার সময় নির্ধারণ করলে তা আরও ভালো ফল দেয়।
পরিশেষে বলা যায়, মেটাবলিজম বা বিপাক এমন একটি ক্রিয়া যা শরীরে শক্তি সরবরাহ করে এবং শরীরকে সক্রিয় রাখে। সকলের জন্য এর চূড়ান্ত সময় একই রকম নয়। তাই ব্যক্তির দেহ অনুযায়ী কাজের জন্য সেরা সময় নির্বাচন করা উচিত। কেউ যেমন সকালে উঠে বেশি কাজ করতে বা মনোযোগ দিতে পারবেন, তেমনই অনেকে বিকেলে বা রাতে সেটি করতে স্বচ্ছন্দ্য বোধ করবেন। এক্ষেত্রে কোনো বাঁধাধরা নিয়ম নেই। আপনার দেহঘড়িকে চিনে তার সঙ্গেই চলুন, সাফল্য আপনার হাতের মুঠোয়।