পুতিনকে সেনাসাহায্য ও ক্ষেপণাস্ত্র দেওয়ার মাঝেই বড় মোড়! কিম জং উনের সঙ্গে কি মুখোমুখি বসছেন ট্রাম্প?

আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চলতি বছরের শেষ দিকে উত্তর কোরিয়ার একনায়ক কিম জং উনের সঙ্গে মুখোমুখি বৈঠকে বসার তীব্র আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। তবে পিয়ংইয়ংয়ের সাম্প্রতিক আক্রমণাত্মক প্রতিক্রিয়া থেকে স্পষ্ট ইঙ্গিত মিলেছে যে, দুই নেতার মধ্যকার ব্যক্তিগত সম্পর্ক যতই মধুর হোক না কেন, নতুন কোনো দ্বিপাক্ষিক আলোচনার টেবিলে বসার জন্য ওয়াশিংটনকে বেশ কঠোর ও কঠিন শর্তের মুখে ফেলতে পারে উত্তর কোরিয়া।

সম্প্রতি দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ সামরিক মহড়ার পরিধি ও তীব্রতা অনেকটাই কমিয়ে দিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। মার্কিন প্রশাসনের এই পদক্ষেপকে উত্তর কোরিয়ার নিরাপত্তার জন্য সরাসরি ‘বৈরী’ মনোভাব হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। এরপরই গত বুধবার ট্রাম্প প্রকাশ্যে জানান যে, চলতি বছরের মধ্যেই কিম জং উনের সঙ্গে দেখা করার জোরালো আশা রাখছেন তিনি। আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলের একাংশের মতে, বর্তমান বিশ্ব রাজনীতিতে একের পর এক কূটনৈতিক স্থবিরতা কাটিয়ে বড় কোনো কূটনৈতিক সাফল্য অর্জনের জন্যই ট্রাম্প এই কূটনৈতিক চাল চেলেছেন।

বিশেষ করে, মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের সঙ্গে দীর্ঘ প্রায় ছয় মাস ধরে চলা তীব্র সংঘাতের অবসান ঘটানোর ক্ষেত্রে যখন কোনো তাৎক্ষণিক বা সুনির্দিষ্ট কূটনৈতিক সমাধান দেখা যাচ্ছে না, ঠিক সেই সংকটময় মুহূর্তেই এশিয়ার মঞ্চে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে ওয়াশিংটন। অন্যদিকে, এই ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার মাঝেই উত্তর কোরিয়া ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়াকে নিয়মিতভাবে সেনা, ক্ষেপণাস্ত্র ও অন্যান্য অত্যাধুনিক সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে।

চলতি বছরের শেষ দিকে চীনের শেনঝেনে অনুষ্ঠিত হতে চলা মর্যাদাপূর্ণ এশিয়া-প্যাসিফিক ইকোনমিক কো-অপারেশন (এপেক) সম্মেলনে ট্রাম্পের অংশ নেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কূটনৈতিক সূত্রের খবর অনুযায়ী, উত্তর কোরিয়া যদি সামান্যতম ইতিবাচক সঙ্কেত দেয়, তবে ওই বিদেশ সফরের সুযোগকে কাজে লাগিয়েই দুই নেতার বহুচর্চিত শীর্ষ বৈঠকটি সম্পন্ন হতে পারে। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের এক মুখপাত্র এই প্রসঙ্গে স্পষ্ট করে জানিয়েছেন যে, কোনো ধরনের পূর্বশর্ত ছাড়াই উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে সরাসরি সংলাপের জন্য যুক্তরাষ্ট্র সর্বদা প্রস্তুত রয়েছে। উপযুক্ত ও অনুকূল সময়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং কিম জং উন পুনরায় এক টেবিলে বসবেন বলেই ওয়াশিংটন আশাবাদী।

তবে পিয়ংইয়ংয়ের তরফ থেকে আসা কড়া প্রতিক্রিয়ায় সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র ফুটে উঠেছে। কিম জং উন এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যেকার ‘চমৎকার ব্যক্তিগত সম্পর্ক’ থাকলেও, পিয়ংইয়ং এটিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো স্থায়ী রাষ্ট্রীয় আলোচনার সমার্থক বলে মনে করছে না। দক্ষিণ কোরিয়ার কিয়ংনাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার ইস্টার্ন স্টাডিজ ইনস্টিটিউটের বিশিষ্ট অধ্যাপক লিম ইউল-চুল এই প্রসঙ্গে মন্তব্য করে জানিয়েছেন যে, দুই নেতার ব্যক্তিগত সৌহার্দ্য কখনোই উত্তর কোরিয়ার জাতীয় নিরাপত্তা বা সামরিক সক্ষমতা জোরদারের মূল অগ্রাধিকারের জায়গাকে গ্রাস করতে পারবে না।

এদিকে, কিম জং উনের অত্যন্ত প্রভাবশালী বোন কিম ইয়ো জং মার্কিন-দক্ষিণ কোরিয়ার যৌথ ‘উলচি ফ্রিডম শিল্ড’ সামরিক মহড়া হ্রাসের সিদ্ধান্তকে পুরোপুরি গুরুত্বহীন এবং লোক দেখানো বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন যে, সীমান্ত এলাকায় এই ধরনের সামরিক মহড়া যখন অব্যাহত রয়েছে, তখন সেটিকে আগ্রাসী মনোভাব ছাড়া অন্য কিছু হিসেবে দেখার কোনো অবকাশ নেই। তাঁর মতে, উত্তর কোরিয়ার প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামগ্রিক নীতি এখনও আগের মতোই অত্যন্ত বৈরী ও আক্রমণাত্মক রয়েছে। একই সঙ্গে তিনি ট্রাম্প ও কিমের মধ্যে সাম্প্রতিক কোনো ধরনের গোপন যোগাযোগের খবর জোরালোভাবে অস্বীকার করলেও, দুই নেতার ব্যক্তিগত সুসম্পর্কের বিষয়টি স্বীকার করে নিয়েছেন।

এই কূটনৈতিক টানাপোড়েনের মাঝেই সামরিক শক্তির প্রদর্শন থামায়নি পিয়ংইয়ং। দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক বাহিনীর নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে যে, বৃহস্পতিবার উত্তর কোরিয়া তাদের পূর্ব উপকূলের দিকে প্রায় ১০টি স্বল্প ও মাঝারি পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ করেছে। প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, চলমান যুক্তরাষ্ট্র-দক্ষিণ কোরিয়া যৌথ সামরিক মহড়ার তীব্র প্রতিবাদ জানাতেই উত্তর কোরিয়া এই একশোটি উসকানিমূলক পদক্ষেপ করেছে। সব মিলিয়ে, ট্রাম্পের বৈঠকের আহ্বানের মুখে কিমের এই ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন উত্তেজনার পারদ চড়িয়ে দিয়েছে।