“প্রধানমন্ত্রী হয়েও ৫০০০ টাকা ঋণ!”-লাল বাহাদুর শাস্ত্রীর সততার গল্প আজও অনুপ্রেরণা জোগায়

ভারতের দ্বিতীয় প্রধানমন্ত্রী লাল বাহাদুর শাস্ত্রী (Lal Bahadur Shastri) ছিলেন ভারতীয় রাজনীতির এক অনন্য ব্যক্তিত্ব। তাঁর আপসহীন সততা, দেশপ্রেম এবং অত্যন্ত সাধারণ জীবনযাপন আজও গোটা দেশের কাছে এক উজ্জ্বল অনুপ্রেরণা। দেশের মতো একটি বিশাল ও গুরুত্বপূর্ণ পদের দায়িত্ব সামলানোর পরেও তাঁর সততা ও স্বচ্ছতা নিয়ে কোনো দিন কেউ প্রশ্ন তুলতে পারেনি। আর এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ লুকিয়ে রয়েছে তাঁর সেই ঐতিহাসিক ঘটনায়, যেখানে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরেও তাঁকে ব্যক্তিগত একটি গাড়ি কেনার জন্য ব্যাঙ্ক থেকে ৫,০০০ টাকা ঋণ নিতে হয়েছিল।

ঠিক কী ঘটেছিল সেই সময়ে?

ঘটনাটি ১৯৬০-এর দশকের গোড়ার দিকের। তখন লাল বাহাদুর শাস্ত্রী দেশের প্রধানমন্ত্রী। সমসাময়িক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব বা মন্ত্রীদের জীবনযাত্রার তুলনায় তাঁর জীবন ছিল অত্যন্ত সাদাসিধে। পরিবারের সদস্যদের যাতায়াতের সুবিধার জন্য তিনি একটি গাড়ি (ফিট গাড়ি) কেনার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু সেই সময়ে একটি নতুন গাড়ি কেনার মতো পর্যাপ্ত নগদ অর্থ তাঁর নিজের বা পরিবারের সঞ্চয়ে ছিল না।

প্রধানমন্ত্রীর মতো একটি সর্বোচ্চ পদে আসীন থাকার পরেও তাঁর কাছে গাড়ি কেনার মতো টাকা না থাকাটা আজ অবিশ্বাস্য মনে হলেও, সেটাই ছিল বাস্তব। তৎকালীন সময়ে একটি ছোট গাড়ি কেনার দাম ছিল প্রায় ১২ হাজার টাকা। শাস্ত্রীর কাছে সব মিলিয়ে মাত্র ৭ হাজার টাকা জমানো ছিল। বাকি ৫,০০০ টাকার ঘাটতি মেটাতে তিনি কোনো অসদুপায় বা সরকারি তহবিল ব্যবহারের কথা বিন্দু মাত্র ভাবেননি।

পঞ্জাব ন্যাশনাল ব্যাঙ্ক থেকে ঋণের আবেদন

টাকার বাকি ঘাটতি মেটাতে লাল বাহাদুর শাস্ত্রী সটান পা বাড়ান ব্যাঙ্কের দিকে। তিনি পঞ্জাব ন্যাশনাল ব্যাঙ্ক (PNB)-এর নয়া দিল্লি শাখায় একটি ঋণের আবেদনপত্র জমা দেন। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নয়, একজন সাধারণ নাগরিক ও চাকরিজীবী হিসেবেই তিনি ওই ৫ হাজার টাকা ঋণের আবেদন করেছিলেন।

ব্যাঙ্ক কর্তৃপক্ষ যখন জানতে পারল যে দেশের প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং তাদের কাছে লোন চেয়ে আবেদন করেছেন, তখন তারা রীতিমতো অবাক হয়ে যায়। ব্যাঙ্কের ডিরেক্টর ও কর্তারা সঙ্গে সঙ্গে তাঁর বাসভবনে এসে তাঁকে কোনো রকম লোন বা সুদ ছাড়াই গাড়িটি উপহার দেওয়ার বা বিনা শর্তে টাকা দেওয়ার প্রস্তাব দেন। কিন্তু শাস্ত্রীজি অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি সাফ জানিয়ে দেন—

“একজন সাধারণ নাগরিক যেভাবে ঋণ পান এবং তা সুদসহ শোধ করেন, আমিও ঠিক সেভাবেই নিয়ম মেনে লোন নেব এবং কিস্তিতে সেই টাকা শোধ করব।”

শেষ পর্যন্ত ব্যাঙ্কের নিয়ম মেনেই ৫ হাজার টাকা লোন মঞ্জুর হয় এবং শাস্ত্রীজি প্রতি মাসে তাঁর বেতন থেকে নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা কেটে নিয়ে সেই ঋণ সম্পূর্ণ শোধ করেন।

প্রধানমন্ত্রীর চেয়ারে বসেও ক্ষমতার অপব্যবহার না করে এক সাধারণ মানুষের মতো সততা ও সততার সঙ্গে জীবন কাটানোর এমন নিদর্শন ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে অত্যন্ত বিরল।