শরীরের এই ৬টি লক্ষণকে ভুল করেও এড়িয়ে যাবেন না! চুপিসারে কখন থাবা বসাচ্ছে ডায়াবেটিস?

আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের মানচিত্রে ভারতকে প্রায়শই বিশ্বের ‘ডায়াবেটিস রাজধানী’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অফ মেডিক্যাল রিসার্চ (ICMR)-এর সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যা যেমন দ্রুত গতিতে বাড়ছে, ঠিক তার চেয়েও অনেক বেশি উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে ‘প্রি-ডায়াবেটিস’ (Prediabetes)-এ আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা। প্রি-ডায়াবেটিস মূলত এমন একটি প্রাথমিক পর্যায়, যেখানে রক্তে শর্করার মাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় অনেকটাই বেশি থাকে, কিন্তু তা এখনও পূর্ণাঙ্গ টাইপ-২ ডায়াবেটিস হিসেবে গণ্য করার মতো যথেষ্ট উচ্চ স্তরে পৌঁছয় না। আমেরিকান ডায়াবেটিস অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গে পার্টনারশিপে সান ফার্মা কর্তৃক পরিচালিত সচেতনতামূলক উদ্যোগ ‘Gyaan by Ganesh’-এর বিশেষজ্ঞদের মতে, সবচেয়ে বিপজ্জনক দিকটি হলো প্রি-ডায়াবেটিসের কোনো স্পষ্ট বা তীব্র প্রাথমিক লক্ষণ প্রকাশ পায় না। এটি অত্যন্ত নিঃশব্দে শরীরে বাসা বাঁধে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায়, একজন সুস্থ মানুষের খালি পেটে রক্তে শর্করার মাত্রা ১০০ mg/dL-এর কম থাকা উচিত। যদি এই মাত্রা ১০০ থেকে ১২৫ mg/dL-এর মধ্যে ঘোরাফেরা করে, কিংবা বিগত ৩ মাসের গড় শর্করার মাত্রা অর্থাৎ HbA1c যদি ৫.৭% থেকে ৬.৪%-এর মধ্যে থাকে, তবে তাকে স্পষ্টভাবে প্রি-ডায়াবেটিস হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এটি আসলে শরীরের এক ধরনের চূড়ান্ত সতর্কবার্তা, যে এই মুহূর্তে জীবনযাত্রায় সঠিক পরিবর্তন না আনলে অদূর ভবিষ্যতে টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।

অধিকাংশ মানুষই যে সূক্ষ্ম শারীরিক লক্ষণগুলিকে সাধারণ অবহেলা বা অন্য কোনো কারণে ভুল বোঝেন, তার মধ্যে প্রথমটি হলো ঘাড় ও বগলের ত্বকে কালচে ভাব। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘অ্যাকান্থোসিস নাইগ্রিকানস’। শরীরে ইনসুলিনের কার্যকারিতা কমে গেলে অর্থাৎ ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স (Insulin Resistance) তৈরি হলে রক্তে অতিরিক্ত ইনসুলিন জমতে শুরু করে, যা ত্বকের কোষগুলোকে দ্রুত বৃদ্ধি করে ত্বককে পুরু ও কালচে করে তোলে। দ্বিতীয় লক্ষণটি হলো ঘাড় বা বগলের চারপাশে অতিরিক্ত ‘স্কিন ট্যাগ’ বা ছোট ছোট নরম মাংসপিণ্ডের মতো আঁচিল দেখা দেওয়া, যা শর্করার বিপাক ক্রিয়া ব্যাহত হওয়ার অন্যতম জোরালো প্রমাণ। তৃতীয়ত, দুপুরের ভারী খাবার খাওয়ার পর যদি শরীরে প্রচণ্ড ঝিমুনি, ক্লান্তি বা অলসতা জাপটে ধরে, তবে বুঝতে হবে শরীর কার্বোহাইড্রেটকে সঠিকভাবে শক্তিতে রূপান্তর করতে পারছে না। চতুর্থত, শরীরের ছোটখাটো ক্ষত বা ছড়ে যাওয়া দাগ শুকোতে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি সময় লাগা রক্ত সঞ্চালন ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ার ইঙ্গিত দেয়। পঞ্চম লক্ষণটি হলো পেট ভরা থাকার পরেও বারবার মিষ্টি বা রিফাইন্ড কার্বোহাইড্রেট খাওয়ার তীব্র ইচ্ছা জাগা এবং ষষ্ঠত, চোখের চশমার পাওয়ার ঠিক থাকা সত্ত্বেও হঠাৎ দৃষ্টিশক্তি সাময়িক আবছা বা ঝাপসা হয়ে যাওয়া।

ভারতীয়দের ক্ষেত্রে এই প্রি-ডায়াবেটিসের ঝুঁকি জিনগত এবং গঠনগতভাবেই কিছুটা বেশি, যাকে চিকিৎসকেরা “এশিয়ান ইন্ডিয়ান ফেনোটাইপ” বলে অভিহিত করেন। অনেক ভারতীয়কে বাইরে থেকে দেখতে সম্পূর্ণ রোগা বা স্লিম মনে হলেও তাঁদের লিভার এবং প্যানক্রিয়াসের চারপাশে বিপজ্জনক চর্বি বা ভিসারাল ফ্যাট (Visceral Fat) জমা থাকে—যাকে চলতি কথায় “Thin Outside, Fat Inside” বলা হয়। এর ফলে আপাতদৃষ্টিতে সুস্থ মানুষের শরীরেও ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স তৈরি হয়। বিশেষ করে যাদের পরিবারে ডায়াবেটিসের বংশগত ইতিহাস রয়েছে, পুরুষদের কোমরের মাপ ৯০ সেমি (৩৫ ইঞ্চি) এবং নারীদের ৮০ সেমি (৩১ ইঞ্চি)-র বেশি (Central Obesity), যারা দীর্ঘদিন ধরে ডেস্কে বসে নিষ্ক্রিয় জীবনযাপন করছেন, যাদের বয়স ৩০ বছরের বেশি, কিংবা যাদের পলিসিস্টিক ওভারিয়ান সিন্ড্রোম (PCOS) বা গর্ভকালীন ডায়াবেটিসের ইতিহাস রয়েছে, তাঁদের অতি অবশ্যই অতিরিক্ত সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। তবে সবচেয়ে আশার কথা হলো, প্রি-ডায়াবেটিস কোনো স্থায়ী রোগ নয়, এটি সম্পূর্ণ একটি ‘রিভার্সিবল কন্ডিশন’। একটু সচেতন হলে সঠিক সময়ে ৫টি ধাপে একে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। প্রথমত, সময়মতো ল্যাবরেটরিতে রক্ত পরীক্ষা করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া। দ্বিতীয়ত, খাদ্যতালিকায় আমূল পরিবর্তন আনা—সাদা ভাত ও ময়দা কমিয়ে ফাইবারসমৃদ্ধ শাকসবজি, প্রোটিন ও ডাল বাড়িয়ে ‘প্লেট মেথড’ অনুসরণ করা। তৃতীয়ত, শারীরিক সক্রিয়তা বাড়ানো অর্থাৎ সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট কার্ডিও ও স্ট্রেংথ ট্রেনিং করা। চতুর্থত, ওজন মাত্র ১০% কমানো এবং পঞ্চমত, দৈনিক ৭-৮ ঘণ্টার গভীর ঘুম ও মানসিক চাপমুক্ত জীবনযাপন করা।