লাখ লাখ শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ নিয়ে ছিনিমিনি! প্রশ্নফাঁস চক্রের মূল মাথা হিসেবে খোদ এনটিএ বিশেষজ্ঞদের নাম ফাঁস

দেশজুড়ে আলোড়ন ফেলে দেওয়া নিট-ইউজি (NEET-UG 2026) পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনাকে নিছক কোনো সাধারণ বা বিচ্ছিন্ন অপরাধ বলে মানতে নারাজ কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা সিবিআই (CBI)। তদন্তে নেমে চাঞ্চল্যকর তথ্য হাতে পেয়েছে কেন্দ্রীয় গোয়েন্দারা। সিবিআই স্পষ্টভাবে জানিয়েছে যে, এই বিশাল কেলেঙ্কারি কোনো বিচ্ছিন্ন ব্যাপার ছিল না, বরং এটি ছিল একটি সুসংগঠিত এবং সুদূরপ্রসারী অপরাধ চক্র, যার জাল গোটা দেশের একাধিক রাজ্যে গভীরভাবে ছড়িয়েছিল। সবথেকে আশঙ্কার বিষয় হলো, এই মেগা কেলেঙ্কারির অন্যতম মূল মাথা বা চক্রী ছিলেন খোদ ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সি বা এনটিএ-র (NTA) নিজস্ব বিষয় বিশেষজ্ঞরা। মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে গোপন ও সংবেদনশীল প্রশ্নপত্র ফাঁস করে দালালদের একটি সুদীর্ঘ চেনের মাধ্যমে তা পরীক্ষার্থীদের হাতে তুলে দেওয়া হতো।

এই চাঞ্চল্যকর মামলায় সিবিআই ইতিমধ্যেই দিল্লির রাউস অ্যাভিনিউয়ের বিশেষ সিবিআই আদালতে মোট ১৩ জন অভিযুক্তের বিরুদ্ধে একটি বিস্তারিত ও বিস্ফোরক চার্জশিট জমা দিয়েছে। চার্জশিটে নাম থাকা অভিযুক্তদের পরিধি অত্যন্ত ব্যাপক, যার মধ্যে এনটিএ-র তিনজন উচ্চপদস্থ বিষয় বিশেষজ্ঞ, নামী কোচিং সেন্টারের মালিক, প্রভাবশালী দালাল এবং বেশ কয়েকজন সুবিধাভোগী পরীক্ষার্থীও সরাসরি যুক্ত রয়েছে। তদন্তকারী আধিকারিকদের যৌথ আতশকাঁচের তলায় থাকা এই ১৩ জনের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো অত্যন্ত গুরুতর।

সিবিআই-এর পেশ করা চার্জশিটে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, এনটিএ কর্তৃক বিশেষভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত তিন জন বিশেষজ্ঞ—উদ্ভিদবিদ্যার মনীষা গুরুনাথ মান্ধারে (A-1), রসায়নের প্রহ্লাদ বিট্টলরাও কুলকার্নি (A-2) এবং পদার্থবিদ্যার মনীষা সঞ্জয় হাবালদার (A-3)—তাঁদের ওপর অর্পিত পদের চরম অপব্যবহার করেছেন। অভিযোগ রয়েছে, পরীক্ষার দিন নির্ধারিত হওয়ার বহু আগেই তাঁরা সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে NEET-UG 2026-এর অতি গোপন প্রশ্নপত্র বাইরে বের করে দেন এবং এই অপরাধমূলক চক্রের বাকি পাণ্ডাদের হাতে তা তুলে দেন।

আইনি ব্যবস্থার ক্ষেত্রে সিবিআই অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কঠোর ভারতীয় ন্যায় সংহিতা (BNS), দুর্নীতি দমন আইন এবং কড়া পাবলিক এক্সামিনেশনস (অসৎ উপায় প্রতিরোধ) আইন, ২০২৪-এর অধীনে সুনির্দিষ্ট ধারায় মামলা রুজু করেছে। তদন্তে প্রকাশ পেয়েছে যে, প্রশ্নপত্র ফাঁসের এই অবৈধ প্রক্রিয়াটি সফল করার জন্য একটি সুনির্দিষ্ট সাপ্লাই চেন বা চক্র তৈরি করা হয়েছিল। প্রথমে এনটিএ-র দায়িত্বপ্রাপ্ত বিশেষজ্ঞরা প্রশ্ন ফাঁস করতেন, এরপর সেই গোপন প্রশ্নপত্র কোচিং অপারেটর ও মধ্যস্থতাকারী দালালদের হাত ঘুরে সুনির্দিষ্ট অঙ্কের বিনিময়ে শেষ পর্যন্ত পরীক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছাত।

তদন্তকারীরা আরও চিহ্নিত করেছেন যে এই বিশাল অপরাধ সিন্ডিকেটে তেজস শাহ (A-4), শিবরাজ মোতেগাঁওকর (A-5), ডঃ মনোজ শিরুরে (A-6), মনীষা সঞ্জয় ওয়াঘমারে (A-7), ধনঞ্জয় লোখান্ডে (A-8), শুভম খৈরনার (A-9), যশ যাদব (A-10), মাঙ্গিলাল বিওয়াল (A-11), দীনেশ বিওয়াল (A-12) এবং বিকাশ বিওয়াল (A-13) অত্যন্ত সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছিল। এদের মধ্যে কেউ সরাসরি প্রশ্নপত্র বাইরে ছড়িয়ে দেওয়ার কাজ করত, আবার কেউ বিশাল অঙ্কের কালো টাকা লেনদেনের নিরাপদ ব্যবস্থা পরিচালনা করত।

এই চক্রের শিকড় কতদূর গভীরে পৌঁছেছিল তা প্রমাণ করতে সিবিআই প্রযুক্তিগত ও ডিজিটাল প্রমাণের ওপর ভরসা রেখেছে। অভিযুক্তদের কাছ থেকে বাজেয়াপ্ত করা একাধিক মোবাইল ফোন, পেন ড্রাইভ এবং অন্যান্য অত্যাধুনিক ডিজিটাল ডিভাইস ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য দেশের শীর্ষস্থানীয় ল্যাবগুলিতে পাঠানো হয়েছিল। ফরেন্সিক রিপোর্টে চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে এসেছে—ডিভাইসগুলির ভেতর থেকে ফাঁস হওয়া নিট প্রশ্নের আসল পিডিএফ (PDF) এবং বিভিন্ন ছবির ফাইল উদ্ধার হয়েছে। সিবিআই তদন্তকারীদের দৃঢ় দাবি, পরীক্ষার বেশ কয়েকদিন আগেই টেলিগ্রাম এবং হোয়াটসঅ্যাপের মতো জনপ্রিয় এনক্রিপ্টেড মেসেজিং অ্যাপের মাধ্যমেই অত্যন্ত গোপনে এই গোপন ফাইলগুলি একের পর এক মোবাইল থেকে মোবাইলে চালাচালি করা হয়েছিল। এই চার্জশিট পেশ হওয়ার পর থেকেই গোটা দেশের শিক্ষা মহলে এবং পরীক্ষার্থীদের অভিভাবকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দানা বাঁধতে শুরু করেছে।