পৃথিবীর দিকে ধেয়ে আসছে প্রলয়ংকরী গ্রহাণু! ধ্বংসলীলা রুখতে নাসার চেয়েও বহুগুণ শক্তিশালী অস্ত্র আনল চীন!

আজ থেকে প্রায় ৪.৬ বিলিয়ন বছর আগে সৌরজগতের সৃষ্টির আদি সময়কার পাথুরে খণ্ডাংশ হিসেবে মহাকাশে জন্ম নেওয়া গ্রহাণুগুলো সাধারণত মঙ্গল ও বৃহস্পতির মাঝখানের সুদূর কক্ষপথেই শান্তভাবে সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে। তবে এদের মধ্যে কিছু বিপজ্জনক গ্রহাণু নিয়মিতভাবেই পৃথিবীর দীর্ঘ কক্ষপথ অতিক্রম করে আমাদের খুব কাছ দিয়ে যাতায়াত করে। যদি এই বিশালকায় গ্রহাণুগুলোর মধ্যে কোনো একটি কোনো কারণে সরাসরি পৃথিবীর সাথে আকস্মিক সংঘর্ষে লিপ্ত হয়, তবে তার কারণে যে ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ সৃষ্টি হবে, তা মানবসভ্যতার জন্য হবে সম্পূর্ণ অকল্পনীয় ও অবর্ণনীয়। এই আসন্ন মহাপ্রলয়ের হুমকির ভয়াবহতা কতটা নিখিল এবং নিদারুণ, তা ২০১৯ সালে ঘটে যাওয়া একটি ঐতিহাসিক ঘটনা থেকেই খুব সহজে অনুমান করা যেতে পারে, যখন ১৩০ মিটার চওড়া একটি বিশালাকার গ্রহাণু আমাদের নীল গ্রহ থেকে মাত্র ৭২,০০০ কিলোমিটারের মতো অত্যন্ত বিপজ্জনক দূরুত্ব দিয়ে সশব্দে অতিক্রম করে চলে গিয়েছিল।

সবচেয়ে মর্মান্তিক ও ভয়ঙ্কর ব্যাপারটি ছিল যে, বিশ্বজুড়ে থাকা প্রমত্ত জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা একেবারে শেষ মুহূর্তে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গেই এত কাছ থেকে এই গ্রহাণুটির আকস্মিক আগমন টের পেয়েছিলেন। ফলে আমাদের মনে স্বাভাবিকভাবেই একটি গভীর ও উদ্বেগের প্রশ্ন জেগে ওঠে যে, অদূর ভবিষ্যতে যদি এমন কোনো অভূতপূর্ব এবং সুবৃহৎ মহাজাগতিক হুমকি সত্যিই আমাদের পৃথিবীর দিকে তীব্র বেগে ধেয়ে আসে, তবে সেই মরণাস্ত্র মোকাবেলার জন্য আধুনিক বিজ্ঞানীদের হাতে ঠিক কী ধরনের কার্যকর ব্যবস্থা বা প্রস্তুতি রয়েছে? বর্তমান বৈজ্ঞানিক পরিমণ্ডলে মানবসভ্যতাকে রক্ষা করার জন্য বিশ্ব প্রধানত দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ গ্রহ প্রতিরক্ষা বা প্ল্যানেটরি ডিফেন্স মডেলের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে রয়েছে: যার একটি হলো মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার বিশ্বখ্যাত ডার্ট মিশন এবং অন্যটি হলো এশিয়ান পরাশক্তি চীনের সদ্য প্রস্তাবিত উচ্চাভিলাষী পারমাণবিক বিস্ফোরণ পরিকল্পনা। আসুন সবিস্তারে জেনে নেওয়া যাক, এই দুই প্রতিদ্বন্দ্বী কৌশলের মধ্যে ঠিক কোন পদ্ধতিটি ভবিষ্যতে আমাদের এই পৃথিবীর একমাত্র প্রকৃত রক্ষাকর্তা বা ত্রাতা হয়ে উঠতে পারে…

প্রথমেই আলোচনা করা যাক নাসার ডার্ট মিশন সম্পর্কে। ২০২২ সালে আমেরিকান মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা সমগ্র বিশ্বকে প্রথমবারের মতো চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছিল যে, পৃথিবীর দিকে তীব্র বেগে ধেয়ে আসা কোনো ধ্বংসাত্মক হুমকির গতিপথ সফলভাবে পরিবর্তন করা সম্পূর্ণ সম্ভব। নাসার বহুল আলোচিত ডার্ট অর্থাৎ ‘ডাবল অ্যাস্টেরয়েড রিডাইরেকশন টেস্ট’ মিশনটি ইচ্ছাকৃতভাবে একটি মনুষ্যবিহীন উচ্চগতির মহাকাশযানকে একটি নির্দিষ্ট গ্রহাণুর মূল দেহের সাথে সজোরে ধাক্কা দিয়েছিল। আধুনিক মহাকাশ গবেষণার সুবিশাল ইতিহাসে এটিই ছিল সম্পূর্ণ প্রথম কোনো বাস্তবসম্মত ও সফল পরীক্ষা। এই কৃত্রিম সংঘর্ষের দুর্দান্ত ফলস্বরূপ গ্রহাণুটির নিজস্ব কক্ষপথের গতি প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ২.৭ মিলিমিটারের সামান্য ভগ্নাংশে হলেও কমে গিয়েছিল এবং এর সামগ্রিক গতিপথ কিছুটা হলেও অন্যদিকে পরিবর্তিত হয়েছিল। যদিও এই বিশেষ কৌশলটি আকারে ছোট গ্রহাণুগুলোর ক্ষেত্রে চমৎকারভাবে কাজ করতে পারে, কিন্তু যদি কয়েকশ মিটার কিম্বা আস্ত একটি কিলোমিটার প্রশস্ত বিশাল আকারের কোনো গ্রহাণু হঠাৎ করেই আকস্মিকভাবে আবির্ভূত হয়, তবে শুধুমাত্র এই ধরনের সরাসরি সংঘর্ষের ফলে উৎপন্ন সীমিত শক্তি সেটিকে থামানোর জন্য মোটেও যথেষ্ট হবে না।

এই পরিস্থিতিতে স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে যে, যদি সরাসরি এই সংঘর্ষ পদ্ধতিটি পুরোপুরি কাজ না করে, তবে পরবর্তী উপায় কী হবে? এই জটিল প্রশ্নের একেবারে নিখুঁত ও বৈজ্ঞানিক উত্তর দিয়েছে বেইজিংয়ের মর্যাদাপূর্ণ ‘চাইনিজ একাডেমি অফ লঞ্চ ভেহিকেল টেকনোলজি’-র একদল মেধাবী গবেষক। গত মে মাসে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ‘স্পেস: সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি’ নামক বৈজ্ঞানিক জার্নালে প্রকাশিত তাদের সুচিন্তিত প্রতিবেদন অনুসারে, হঠাৎ করে পৃথিবীর দিকে এগিয়ে আসা একটি প্রকাণ্ড আকারের বিশাল গ্রহাণুকে মাঝপথে সফলভাবে আটকানোর সবচেয়ে কার্যকর এবং নিশ্চিত উপায় হলো একটি শক্তিশালী পারমাণবিক বোমা দিয়ে মহাকাশেই সেটিকে সম্পূর্ণ বিস্ফোরিত করে গুঁড়িয়ে দেওয়া। এই অভিনব ও রোমহর্ষক পদ্ধতিটি দেখতে দেখতে আমাদের ১৯৯৮ সালের সেই বিখ্যাত ও জনপ্রিয় হলিউড ব্লকবাস্টার চলচ্চিত্র ‘আর্মাগেডন’-এর কথা খুব স্পষ্টভাবে মনে করিয়ে দেয়, কিন্তু বাস্তবিকভাবে চীনের এই বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনাটি হবে সম্পূর্ণ চালকবিহীন এবং অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট নিখুঁত প্রযুক্তিনির্ভর। চীনের এই অভিনব দুই-ধাপের বা টু-স্টেপ মডেলটি মূলত ঠিক যেভাবে কাজ করবে তা হলো—প্রথমে, একটি দ্রুতগামী বিশেষ মহাকাশযান গ্রহাণুটির মূল পৃষ্ঠের দিকে অত্যন্ত বেগে একটি ভারী ধাতব ভেদক নিক্ষেপ করবে, যা ওই গ্রহাণুর শক্ত পৃষ্ঠে প্রায় ৩০ মিটার বা প্রায় ১০০ ফুট গভীর একটি বিরাট গর্ত তৈরি করবে। এর ঠিক পেছনেই অত্যন্ত নিখুঁত সমূদ্রসম গতিতে ধেয়ে আসা দ্বিতীয় মহাকাশযানটি ওই পূর্বনির্ধারিত ৩০ মিটার গভীর গর্তের ভেতর একটি শক্তিশালী পারমাণবিক বোমা নিখুঁতভাবে স্থাপন করে সেটির সুভীষণ বিস্ফোরণ ঘটাবে।

এই উচ্চাভিলাষী পারমাণবিক ধারণার বাস্তব কার্যকারিতা যাচাই করার জন্য চীনা বিজ্ঞানীরা প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ১০ কিলোমিটার অবিশ্বাস্য বেগে সরাসরি পৃথিবীর দিকে ধেয়ে আসা বিভিন্ন কাল্পনিক গ্রহাণু নিয়ে একটি অত্যন্ত জটিল কম্পিউটার সিমুলেশন পরিচালনা করেছিলেন। আর সেই পরীক্ষার প্রাপ্ত ফলাফল ছিল এককথায় অত্যন্ত বিস্ময়কর। গবেষণায় দেখা গেছে যে, একটি ৫০-মিটার আকারের ক্ষুদ্র গ্রহাণুকে মাঝপথেই সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করার জন্য মাত্র ৩০০-কিলোটন ক্ষমতার একটি পারমাণবিক বিস্ফোরণই (যা মোটামুটিভাবে একযোগে প্রায় ২০টি হিরোশিমা পারমাণবিক বোমার ধ্বংসাত্মক শক্তির সমতুল্য) সম্পূর্ণরূপে যথেষ্ট হবে। অন্যদিকে, ১০০-মিটার ব্যাসের একটি মাঝারি গ্রহাণুকে সম্পূর্ণরূপে গুঁড়ো করে দিতে প্রায় ৩ মেগাটনের একটি বিশাল বিস্ফোরণের প্রয়োজন হবে (যা প্রায় ২০০টি হিরোশিমা বোমার ধ্বংস ক্ষমতার সমান)। আর যদি ১ কিলোমিটার বা তারও বেশি সুবৃহৎ ব্যাসের কোনো প্রকাণ্ড গ্রহাণু পৃথিবীর দিকে আসে, তবে এত বিশালকায় বস্তুকে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করা হয়তো কঠিন হবে, কিন্তু অত্যন্ত নিখুঁতভাবে এর গতিপথ পুরোপুরি পরিবর্তন করে নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে দেওয়া নিশ্চিতভাবেই সম্ভব। গবেষকদের মতে, যদি ওই বিশাল গ্রহাণুর পৃষ্ঠ থেকে ঠিক ৩০ মিটার গভীরে একটি ৩-মেগাটনের শক্তিশালী পারমাণবিক বোমা বিস্ফোরিত করা যায়, তবে এই অভিনব ধাক্কায় এর নিজস্ব গতি প্রতি সেকেন্ডে অন্তত ৩০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত নাটকীয়ভাবে পরিবর্তিত হয়ে যাবে।

সবচেয়ে বড় এবং চমকপ্রদ কথা হলো, ভূপৃষ্ঠের ঠিক ৩০ মিটার গভীরে এই সুনির্দিষ্ট পারমাণবিক বিস্ফোরণ ঘটানোর পদ্ধতিটি নাসার প্রচলিত ডার্ট মিশনের তুলনায় প্রায় ১১০ গুণ বেশি কার্যকর ও শক্তিশালী প্রমাণিত হয়েছে। অধিকন্তু, বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে যে গ্রহাণুর ভূপৃষ্ঠের মাত্র ১০ মিটার নিচে বোমা বিস্ফোরণ ঘটানোর চেয়ে একেবারে ৩০ মিটার নিচে বোমা ফুটিয়ে তোলা প্রায় তিন গুণ বেশি ফলপ্রসূ হয়। কিন্তু সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে যে, বিজ্ঞানীরা কেন সরাসরি সাধারণ গ্রহাণু দিয়ে আঘাত করে বা সোজা ওপর থেকে পারমাণবিক বোমার বিস্ফোরণ ঘটিয়ে কাজ চালান না? এই প্রশ্নের ব্যাখ্যায় গবেষকরা জানিয়েছেন যে, একটি পরমাণু বোমা যদি সরাসরি প্রতি সেকেন্ডে ২০ কিলোমিটারের প্রচণ্ড গতিতে গিয়ে সোজা গ্রহাণুতে আঘাত করে, তবে বিস্ফোরণ ঘটার আগেই প্রবল অভিঘাতে সেটি সম্ভবত বিধ্বস্ত হয়ে ছোট ছোট টুকরো হয়ে মহাকাশে ছড়িয়ে পড়বে। সেই কারণেই চীনের এই বিশেষ দ্বি-পদক্ষেপ পদ্ধতিটি অত্যন্ত সুকৌশলে বোমাটিকে গ্রহাণুর অভ্যন্তরে একটি সম্পূর্ণ নিরাপদ গভীরতায় স্থাপন করার সুযোগ করে দেয়, যার ফলস্বরূপ বিস্ফোরণের সমস্ত টোটাল শক্তি সরাসরি ওই ক্ষতিকারক গ্রহাণুটির মূল দেহের ওপর স্থানান্তরিত হয়।

অবশ্য এই সমস্ত বৈজ্ঞানিক সাফল্যের আলোচনার পাশাপাশি একথাও স্বীকার করতে হবে যে, এর সাথে জড়িত চ্যালেঞ্জগুলোও নেহাত কম নয়। চীনের এই অভিনব ও সাহসী প্রস্তাবটি শুনতে যতটা সহজে আকর্ষণীয় ও জাদুকরী মনে হয়, বাস্তবিক্ষেত্রে এটিকে মহাশূন্যে সফলভাবে রূপায়ন করা ততটা সহজ বা জলভাত নয়। খোদ গবেষকরাই অকপটে স্বীকার করেছেন যে, এই দুটি আলাদা মহাকাশযান সংবলিত অত্যন্ত জটিল এবং স্পর্শকাতর অভিযানটিকে সম্পূর্ণ নিখুঁতভাবে সময়ের মাপে সম্পন্ন করতে হলে গ্রহাণুটির উপস্থিতি বহু আগেই আগাম শনাক্ত করা অত্যন্ত অপরিহার্য। তাছাড়া, এত ভারী পারমাণবিক পেলোড এবং বিশেষ ধাতব পেনিট্রেটরকে সফলভাবে গভীর মহাকাশের সুদূর কোণে পাঠানোর জন্য অত্যন্ত শক্তিশালী হেভি-লিফট লঞ্চ ভেহিকল বা রকেটের প্রয়োজন হবে, যা বর্তমান যুগে এক বিরাট প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ।