সংসদ চত্বরে কালো পোশাকের ঝড়! মোদী সরকারের বিরুদ্ধে গর্জে উঠলেন রাহুল-প্রিয়াঙ্কা-অখিলেশ

রাজধানী দিল্লির বুকে ছাত্র আন্দোলনের তীব্রতা ও প্রতিবাদের আগুন এখন সরাসরি আছড়ে পড়েছে জাতীয় সংসদের চত্বরে। বুধবার সকাল হতে না হতেই সংসদের প্রাঙ্গণে কালো পোশাক পরে অভিনব ও তীব্র বিক্ষোভে ফেটে পড়েন বিরোধী দলের তাবড় সাংসদরা। চলমান ছাত্র বিক্ষোভের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করে এবং কেন্দ্রীয় সরকারের দমনপীড়নের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে এই প্রতিবাদ কর্মসূচি পালিত হয়। এদিনের এই বিক্ষোভ মিছিলে লোকসভায় বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী, প্রিয়াঙ্কা গান্ধী বঢরা, সমাজবাদী পার্টির প্রধান অখিলেশ যাদব এবং তৃণমূল কংগ্রেসের প্রবীণ সাংসদ সৌগত রায়সহ ‘ইন্ডিয়া’ (INDIA) জোটের একাধিক শীর্ষস্থানীয় নেতা স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেন। অন্যদিকে, গত মঙ্গলবার গভীর রাতে যন্তর মন্তরের প্রতিবাদী মঞ্চ থেকেই একটি তীব্র ও ধারালো ভিডিও বার্তা প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকে সরাসরি নিশানা করেছিলেন কৃষ্ণনগরের তৃণমূল সাংসদ মহুয়া মৈত্র। তিনি কড়া ভাষায় কটাক্ষ করে বলেছিলেন যে, সাধারণ ছাত্রসমাজ এবং প্রতিবাদীরা আজ আর সরকারকে ভয় পায় না, আর যাঁরা তাঁদের দেখে ভয় পান না, সেই সমস্ত লড়াকু মানুষকে কীভাবে সামাল দিতে হয় তা আদতে মোদী-শাহ জুটি জানেনই না। বর্তমান এই নজিরবিহীন গণবিক্ষোভ মোদী সরকারের রাজনৈতিক কৌশলের কাছে সম্পূর্ণ ‘আউট অফ সিলেবাস’ বা পাঠ্যক্রমের বাইরের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে তীব্র আক্রমণ শানিয়েছেন মহুয়া।
গত বেশ কয়েকদিন ধরেই যন্তর মন্তরের চত্বরে লাগাতার ছাত্র বিক্ষোভ এবং পরিবেশকর্মী সোনম ওয়াংচুকের দীর্ঘ অনশন আন্দোলনকে কেন্দ্র করে দিল্লির রাজনৈতিক পরিস্থিতি অত্যন্ত উত্তপ্ত ও অগ্নিগর্ভ হয়ে রয়েছে। ককরোচ জনতা পার্টির আন্দোলন এবং নিট (NEET) পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসসহ নানা অনিয়মের প্রতিবাদে ফুঁসছে দেশের ছাত্রসমাজ। এরই মাঝে মঙ্গলবার রাতে যন্তর মন্তরের উত্তাল মঞ্চে সশরীরে হাজির হয়ে মহুয়া মৈত্র আন্দোলনের গতিপ্রকৃতি তুলে ধরে বলেন যে, এই দেশের ছাত্ররা সহজে থেমে যাওয়ার পাত্র নন। বুধবার সকালেই সেই প্রতিবাদের মূল ঝাঁজ আরও কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিতে বিরোধী সাংসদরা সুপরিকল্পিতভাবে সংসদ প্রাঙ্গণে কালো জামা পরে বিক্ষোভে শামিল হন। দেশের লাখ লাখ শিক্ষার্থীর মৌলিক অধিকারের জোরালো পক্ষে সওয়াল করে কংগ্রেস সাংসদ প্রিয়াঙ্কা গান্ধী বঢরা অত্যন্ত ক্ষোভের সুরে কেন্দ্রীয় সরকারকে কাঠগড়ায় দাঁড়ান। তিনি পরিসংখ্যান টেনে বলেন, যেখানে দেশের শিক্ষাক্ষেত্রের সামগ্রিক বাজেট ১.৪ লক্ষ কোটি টাকা, ঠিক সেখানে ধনিক শ্রেণি তথা শিল্পপতি আদানি ও আম্বানির ১৬ লক্ষ কোটি টাকার বিশাল অঙ্কের ঋণ অনায়াসে মকুব করে দেওয়া হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের এই ঐতিহাসিক সংগ্রাম সম্পূর্ণ ন্যায়সঙ্গত এবং তারা দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন চাইছে। বারবার দেশজুড়ে প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ঘটলেও সরকার উদাসীন। শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক বিক্ষোভে কোনো বেআইনি বা অগণতান্ত্রিক বিষয় থাকতে পারে না, কিন্তু শিক্ষার্থীদের ওপর এবং খোদ সংসদের ভেতরে যা চলছে, তা সম্পূর্ণ অগণতান্ত্রিক ও স্বৈরাচারী বলে তোপ দাগেন তিনি।
এদিকে, গত মঙ্গলবার লোক কল্যাণ মার্গে (LKM) কংগ্রেসের পূর্বনির্ধারিত শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ চলাকালীন দিল্লি পুলিশ কর্তৃক রাহুল গান্ধী এবং প্রিয়াঙ্কা গান্ধীসহ দলের একাধিক শীর্ষ নেতাকে জোর করে আটক করার তীব্র নিন্দা করেছেন কংগ্রেস সভাপতি তথা রাজ্যসভায় বিরোধী দলনেতা মল্লিকার্জুন খাড়গে। এই ঘটনার জেরে তীব্র ক্ষোভ উগরে দিয়ে খাড়গে স্পষ্ট ভাষায় বলেন যে, এটি কোনোভাবেই কোনো প্রথাগত ও গণতান্ত্রিক সরকার নয়, বরং বর্তমান শাসকদল এক একনায়কতন্ত্রের মতো একরোখা কায়দায় দেশ শাসন করছে। তারা দেশের নির্বাচিত সাংসদদের পর্যন্ত ন্যূনতম সম্মান দিতে জানে না। এমনকি যাঁরা সম্পূর্ণ নিয়ম মেনে শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ জানাচ্ছেন, তাঁদেরও প্রশাসনের তরফ থেকে নানাভাবে হেনস্তা করা হচ্ছে। তিনি আরও মারাত্মক অভিযোগ করে বলেন যে, বিজেপি ও আরএসএস-এর কর্মীরা কোনো নির্দিষ্ট অফিশিয়াল ব্যাজ ছাড়াই গোপনে পুলিশের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যৌথভাবে কাজ করছে এবং তারা পরোক্ষভাবে দেশের ছাত্রসমাজ ও বিরোধী রাজনৈতিক নেতাদের মনে ত্রাস সৃষ্টি করার চেষ্টা চালাচ্ছে। প্রবীণ নেতাদের ওপর এই দমনপীড়ন চললে দেশের সাধারণ মানুষ চুপ করে বসে থাকবে না এবং লক্ষ লক্ষ জনতা রাজপথে রুখে দাঁড়াবে বলে হুঁশিয়ারি দেন তিনি।
সংসদের বাইরে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে কংগ্রেস সাংসদ পবন খেরা এএনআই (ANI) সংবাদসংস্থাকে বিস্তারিত জানিয়ে বলেন যে, দেশের রাজধানীর বুকে সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যে অমানবিক আচরণ করা হয়েছে, কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে কোনো অবস্থাতেই তাঁর পদ থেকে না সরানোর যে জেদ সরকার ধরে বসে রয়েছে এবং শিক্ষার্থীদের ন্যায্য অসন্তোষের প্রতি সরকার যে অত্যন্ত নির্বিকার ও নেতিবাচক মনোভাব দেখাচ্ছে—তারই তীব্র প্রতিবাদ জানাতে আজ বিরোধী দলের সমস্ত সাংসদ একযোগে কালো পোশাক পরে সংসদে এসেছেন। উল্লেখ্য, মঙ্গলবার লোক কল্যাণ মার্গের উত্তপ্ত বিক্ষোভের সময় দিল্লি পুলিশ কংগ্রেস সাংসদ রাহুল ও প্রিয়াঙ্কা গান্ধীকে আটক করলেও পরবর্তীতে তাঁদের ছেড়ে দেয়। কিন্তু সংসদের অন্দরমহল থেকে শুরু করে বাইরে রাজপথ—সব জায়গাতেই সরকারের বিরুদ্ধে বিরোধী জোটের সম্মিলিত হুংকার এখন রাজনৈতিক উষ্ণতা বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।