ঘুম ভাঙাতে লড়ছে জীবন! নতুন প্রজন্মের না বলা সংগ্রামের গল্প নিয়ে এল ‘গেট আপ কিংশুক’

একটি সাধারণ সমস্যা কি কখনও একজন মানুষের পুরো জীবনটাই আমূল বদলে দিতে পারে? যদি এই প্রশ্নের সঠিক উত্তর খুঁজতে হয়, তাহলে পরিচালক নন্দন ঘোষের নতুন বাংলা ছবি ‘গেট আপ কিংশুক’ তার সবচেয়ে সহজ ও নিখুঁত উত্তর। বর্তমান সময়ের মূলধারার বাংলা ছবিতে যেখানে মেগা বাজেট, চেনা তারকাদের ভিড় কিংবা জমকালো আয়োজনকে সাফল্যের চাবিকাঠি বলে মনে করা হয়, সেখানে সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুতে দাঁড়িয়ে কেবল একটি ছোট্ট ও বাস্তবধর্মী গল্প কীভাবে মানুষের মনে গভীর ছাপ ফেলতে পারে, তা অত্যন্ত সুন্দরভাবে দেখিয়ে দিল এই ছবি। ছবির মূল কেন্দ্রে রয়েছে কিংশুক নামের এক সাধারণ তরুণ। যার স্বপ্নগুলো আজকের যুগের অন্য হাজারো তরুণের মতোই একদম সাধারণ—নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে সাবলম্বী হওয়া, পরিবারের পাশে দাঁড়ানো এবং সম্মানজনকভাবে জীবন কাটানো। কিন্তু শহুরে যান্ত্রিক জীবন তাকে যতটা না কঠিন পরীক্ষার সামনে দাঁড় করায়, তার থেকেও অনেক বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায় তার নিজের শরীর।
কিংশুক এক অদ্ভুত ও জটিল সমস্যায় ভোগে, যেখানে ঘুম যেন তাকে প্রতিনিয়ত জীবনযুদ্ধে পরাজিত করে। হাজার ইচ্ছে এবং চেষ্টা সত্ত্বেও সে ঠিক সময়ে ঘুম থেকে উঠতে পারে না। চাকরি নামক সোনার হরিণ ধরা, প্রেমের সম্পর্ক টিকিয়ে রাখা, সামাজিক দায়িত্ব পালন এবং নিজের আত্মসম্মান রক্ষা করা—সবকিছুর মাঝখানে এই অদ্ভুত শারীরিক সমস্যা ধীরে ধীরে তার জীবনের সবচেয়ে বড় শত্রু হয়ে ওঠে। শুনতে বিষয়টি প্রথমটায় কিছুটা মজার বা অদ্ভুত মনে হতে পারে, কিন্তু পরিচালক এই ছবিটিকে কখনোই কোনো সস্তা ঠাট্টা বা কৌতুকের উপাদান বানানোর ভুল করেননি। বরং একজন তরুণ যুবকের চরম অসহায়তা, বুকের ভেতরে জমে থাকা তীব্র আত্মগ্লানি এবং নিজেকে সমাজে প্রমাণ করার অন্তহীন লড়াইকে অত্যন্ত সংযত ও পরিমিতভাবে রূপালি পর্দায় তুলে ধরেছেন। ছবির এই অনন্য সংযমই হলো এর সবচেয়ে বড় শক্তির জায়গা। গল্প অত্যন্ত শ্লথ ও স্বাভাবিক গতিতে এগিয়ে চলে, কিন্তু কোথাও কোনো অযথা নাটকীয়তার আশ্রয় নেয় না। ফলে কিংশুকের ব্যর্থতা, তার জীবনের ছোট ছোট সাফল্য কিংবা প্রতিদিনের বেঁচে থাকার সংগ্রাম দর্শকের কাছেও অত্যন্ত ব্যক্তিগত ও আপন হয়ে ওঠে।
সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, পরিচালক এই ছবিতে কোনো রকম চর্বিতচর্বণ সামাজিক বার্তা দেওয়ার জোরাজুরি চেষ্টা করেননি। বরং অতি সাধারণ মানুষের যাপিত জীবনকে খুব কাছ থেকে অবলোকন করেছেন। আর সেই কারণেই ছবির প্রতিটি পরতে থাকা আবেগ এতটা বিশ্বাসযোগ্য ও মনোগ্রাহী হয়ে উঠেছে। ছবিতে যেমন রয়েছে রঙিন স্বপ্ন, তেমনই রয়েছে নির্মম হতাশা, চাকরির তীব্র অনিশ্চয়তা, পরিবারের বিরাট প্রত্যাশা এবং তার সঙ্গে মেলা খাঁটি ভালোবাসা। এই সমস্ত বিভিন্ন স্তর নিখুঁতভাবে মিলেমিশে ছবিটিকে একটি অনবদ্য ‘কামিং অফ এজ’ অভিজ্ঞতায় রূপ দিয়েছে। নতুন শিল্পীদের নিবেদিতপ্রাণ অভিনয় ছবির অন্যতম প্রধান দিক, যা দর্শকের চোখে পড়ার মতো। মুখ্য চরিত্রে শাহির রাজের অভিনয়ে কোনো কৃত্রিমতা বা বাড়তি ভান নেই। তাঁকে দেখে মনে হয়, এমন একটি সাধারণ ছেলেকে আমরা আমাদের প্রতিদিনের যাতায়াতে বা আশপাশেই দেখতে পাই। পাশাপাশি রাজশ্রী বিশ্বাস, ভাগ্যশ্রী রায়চৌধুরী, দীপান্বিতা ত্রিনা দাস, সন্দীপন তপাদার এবং অন্যান্য কলাকুশলীরাও নিজেদের চরিত্রের সঙ্গে সম্পূর্ণ ন্যায়বিচার করেছেন। পরিচালক নতুন মুখদের নিয়ে যে আত্মবিশ্বাসী কাস্টিং করেছেন, তা এক কথায় প্রশংসার যোগ্য।
অবশ্য ‘গেট আপ কিংশুক’ নিখুঁত কোনো মাস্টারপিস, এমন দাবি করারও সুযোগ নেই। ছবির চিত্রনাট্য কোথাও কোথাও একটু বেশি তাড়াহুড়ো করে এগিয়ে গেছে। কিছু নির্দিষ্ট দৃশ্যে পরিচালক যদি আরও খানিকটা সময় ব্যয় করতেন, তবে চরিত্রগুলোর ভেতরের আবেগ, মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব এবং সম্পর্কের গভীরতা আরও অনেক বেশি স্পষ্ট ও জোরালো হয়ে উঠতে পারত। বিশেষ করে কিংশুকের জীবনের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক পর্দায় যতটা স্থান পাওয়ার কথা ছিল, তা পুরোপুরি পায়নি। তা সত্ত্বেও এই ছোটখাটো সীমাবদ্ধতাগুলি ছবিটিকে কখনই ম্লান করে দিতে পারেনি। মূলত ‘গেট আপ কিংশুক’ কেবল ঘুমের কোনো চ্যাপ্টা গল্প নয়, এটি মূলত আজকের প্রজন্মের আদ্যোপান্ত গল্প। যে প্রজন্ম প্রতিদিন সকালে নতুন হাজারো স্বপ্ন নিয়ে ঘুম থেকে ওঠে, আবার ঠিক একই সঙ্গে প্রতি মুহূর্তে কোনো না কোনো অদৃশ্য বাধার বিরুদ্ধে লড়াই করে চলে। কারও সেই বাধা নিছক অর্থনৈতিক, কারও পারিবারিক, আবার কারও মানসিক, ঠিক যেমন কিংশুকের ক্ষেত্রে তা একটি জটিল শারীরিক সমস্যা। চেনা ছকের ফর্মুলা থেকে বেরিয়ে এসে, অত্যন্ত কম বাজেটে এবং সম্পূর্ণ নতুন শিল্পীদের নিয়ে তৈরি এই ছবি প্রমাণ করে যে একটি ভালো গল্প বলতে কোনো ‘স্টার’ বা তারকার প্রয়োজন হয় না, তার জন্য প্রয়োজন হয় এক ফোঁটা আন্তরিকতা, সৎ নির্মাণশৈলী এবং এমন কিছু জীবন্ত চরিত্র, যাদের মধ্যে দর্শক নিজের জীবনেরই কোনো না কোনো প্রতিচ্ছবি খুঁজে পায়। সেই কারণেই এই ছবি হয়তো বিরাট কোনো মহাকাব্য নয়, কিন্তু মনের অনেক গভীরে দাগ কেটে যাওয়ার মতো ‘কিছু একটা’ তো বটেই।