রথে জগন্নাথ নেই, তবুও ভক্তদের ঢল! রানিগঞ্জের সিহাড়শোল রাজবাড়ির এই রথ কেন এত আলাদা?

পশ্চিম বর্ধমানের রানিগঞ্জের সিহাড়শোল রাজবাড়ির রথযাত্রা মানেই প্রায় ১৯০ বছরের এক অমলিন ঐতিহ্যের নাম। ব্রিটিশ আমলের সেই গৌরবময় ইতিহাস আজও সমানভাবে বর্তমান। ধর্মীয় আবেগ, নিষ্ঠা এবং উৎসবের আবহে এবারের রথযাত্রাতেও এক অভূতপূর্ব উদ্দীপনা লক্ষ্য করা গেল। এই মহোৎসবে অংশ নিতে রাজবাড়ির প্রাঙ্গণে হাজির হয়েছিলেন রাজ্যের পুর ও নগরোন্নয়ন মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল, জনস্বাস্থ্য কারিগরি ও পূর্ত দফতরের মন্ত্রী অজয় পোদ্দার এবং রানিগঞ্জের বিধায়ক পার্থ ঘোষ। তিনজনেই ঐতিহ্যবাহী পিতলের রথের দড়িতে টান দিয়ে রথযাত্রার শুভ সূচনা করেন।
রাজবাড়ির এই রথযাত্রা পশ্চিমবঙ্গের অন্যান্য রথযাত্রা থেকে বেশ খানিকটা আলাদা। এখানে রথে জগন্নাথ, বলরাম বা সুভদ্রার অধিষ্ঠান হয় না। পারিবারিক শতাব্দীপ্রাচীন প্রথা অনুযায়ী, পিতলের তৈরি রথে রাজপরিবারের কুলদেবতা দামোদরচন্দ্র জিউর পুজো হয় এবং তাঁকে রথে প্রতিষ্ঠা করা হয়। রথযাত্রার দিন সকালে বিশেষ পুজোর পর রথটি টেনে নিয়ে যাওয়া হয় রাজবাড়ি থেকে প্রায় ৫০০ মিটার দূরের পুরনো রাজবাড়ির মাঠে। এই রথের দড়িতে হাত লাগাতে দূর-দূরান্ত থেকে ভিড় জমান অসংখ্য পুণ্যার্থী। ভক্তদের অগাধ বিশ্বাস, এই রথের দড়ি টানলে পুণ্যলাভ হয়। উল্টোরথের দিন পুনরায় কুলদেবতা তাঁর নিজস্ব স্থানে ফিরে আসেন।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট অনুযায়ী, ১৮৩৬ সালে রাজা গোবিন্দপ্রসাদ পণ্ডিতের হাত ধরে সিহাড়শোলে রথযাত্রার সূচনা হয়েছিল। তৎকালীন কাঠের রথটি এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ভস্মীভূত হওয়ার পর, ১৯২২ সালে মাহেশের রথের আদলে প্রায় ৩৫ ফুট উচ্চতার এই নজরকাড়া পিতলের রথটি নির্মাণ করা হয়। যা আজও রাজবাড়ির ঐতিহ্যকে ধরে রেখেছে।
এদিন রথযাত্রায় অংশ নিয়ে মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল বলেন, “আগে রানিগঞ্জের মানুষের মনে অনেক ভয় ছিল, রাস্তায় বেরোনোর ক্ষেত্রে বাধা ছিল। কিন্তু এখন সেই ভয়ের দিন শেষ। মানুষের মনে এখন উৎসবের আনন্দ ও ভরসা ফিরে এসেছে। রানি ও যুবরাজের সঙ্গে দেখা করে রথযাত্রার এই জন-উৎসবে শামিল হতে পেরে খুব ভালো লাগছে।”
রথযাত্রাকে কেন্দ্র করে প্রতি বছর সিহাড়শোল রাজবাড়ি চত্বরে বসে বিশাল মেলা। খেলনা, মিষ্টি, গ্রামীণ হস্তশিল্প এবং খাবারের দোকানে উপচে পড়া ভিড় প্রমাণ করে রানিগঞ্জের কাছে এই উৎসব কেবল একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, বরং এক মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে। রানিগঞ্জ ছাড়াও পাশের বিস্তীর্ণ এলাকা থেকে মানুষ ভিড় জমিয়েছেন এই ঐতিহ্যবাহী রাজকীয় রথ দেখতে। সব মিলিয়ে ১৯০ বছরের পুরনো এই রথযাত্রা আবারও প্রমাণ করল, সময়ের স্রোতে ঐতিহ্যের আবেদন আজও অমলিন।