আবু সাঈদের সেই বুক চিতানো মুহূর্ত! আজও ছেলের ছবি বুকে আগলে দিন কাটছে মা-বাবার, জানুন অদেখালিপি

জুলাইয়ের উত্তাল দুপুরে পুলিশের বন্দুকের সামনে দুই হাত প্রসারিত করে দাঁড়িয়ে থাকা আবু সাঈদ। রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই ছাত্রের অকুতোভয় মূর্তি এখনো অনেকের চোখে ভাসে। কিন্তু সেই বীরত্বের আড়ালে এক নিঃস্ব বাবা-মা’র হাহাকার আজও থামেনি। তাদের কাছে একমাত্র সম্বল ছেলের বাঁধানো পাসপোর্ট সাইজের একটি ছবি। মা মনোয়ারা বেগম এখনো আলগোছে কাপড় দিয়ে মুছে সেই ছবি আগলে রাখেন। বাবা মকবুল হোসেন প্রতিদিন কবরের পাশে গিয়ে দাঁড়িয়ে ভাবেন, “ছেলেটা বেঁচে থাকলে আজ হয়তো বিয়ে করত, চাকরি করত, আমাদের সামনেই থাকত। কিন্তু কিছুই হলো না!”

২০২৪ সালের ১৬ জুলাই। কোটা সংস্কার আন্দোলনে নামা আবু সাঈদের মৃত্যু সেদিন বাংলাদেশের ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল। পুলিশের গুলিতে তার মৃত্যুসংবাদ ও ভিডিও মুহূর্তের মধ্যে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছিল সারা দেশে। লেখক ও রাজনীতি বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদের মতে, আবু সাঈদের মৃত্যু দুটি বড় পরিবর্তন ঘটিয়েছিল। এক, আন্দোলনে সর্বস্তরের মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ও ঐক্য নিশ্চিত করেছিল। দুই, এই মৃত্যুই অরাজনৈতিক কোটা সংস্কার আন্দোলনকে ‘হাসিনা হটাও’ বা সরকার পতন আন্দোলনে রূপ দিয়েছিল। তিনি বলেন, “১৯৬৯ সালে আসাদের মৃত্যু বা ১৯৯০-এ ডাক্তার মিলনের আত্মত্যাগ যেমন গণঅভ্যুত্থানকে ত্বরান্বিত করেছিল, আবু সাঈদের মৃত্যুও জুলাই বিপ্লবে ঠিক সেই সঞ্জীবনী শক্তির কাজ করেছে।”

কিন্তু সেই ঐক্যের বাস্তবতা এখন বড়ই করুণ। ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার দেশ ছাড়ার পর বাংলাদেশে যে রাজনৈতিক শূন্যতা তৈরি হয়েছিল, তা পূরণ করা নিয়েই মূলত হোঁচট খেয়েছে জুলাইয়ের সেই অটুট ঐক্য। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সামিনা লুৎফার মতে, ইউনিয়ন পর্যায় থেকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ স্তর পর্যন্ত ক্ষমতা ও নিয়ন্ত্রণের যে নতুন বিন্যাস বা ‘বিলি-বণ্টন’ প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল, তা-ই ছিল ঐক্যে ভাঙনের মূল কারণ।

ক্ষমতার এই প্রতিযোগিতায় বিএনপি থেকে শুরু করে জামায়াতে ইসলামী এবং অভ্যুত্থানের নেতৃত্বে থাকা ছাত্রনেতারা—সবাই এক অলিখিত দ্বৈরথে জড়িয়ে পড়েছেন। কেউ সচিবালয়ে নিজের লোক বসাতে ব্যস্ত, কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ের দখল নিতে মরিয়া। এই রেষারেষি আর ক্রেডিট নেওয়ার লড়াই জুলাইয়ের সেই মহান আত্মত্যাগের চেতনাকে আজ এক প্রশ্নচিহ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। আবু সাঈদের বাবা মকবুল হোসেনের অতৃপ্ত আত্মাও হয়তো খুঁজছে, তার ছেলের রক্তের বিনিময়ে পাওয়া ‘নতুন বাংলাদেশ’ কি সত্যিই তাদের স্বপ্নের মতো হয়েছে? না কি ক্ষমতার দাবার বোর্ডে হারিয়ে গেছে সেই জুলাইয়ের অমর ঐক্য? আজ সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে গোটা জাতি।