রথযাত্রায় কামারপুকুরে ফিরল শ্রীরামকৃষ্ণের স্মৃতি! ধানের চারা রোপণ করে পালিত হল শতবর্ষের প্রাচীন প্রথা

রথযাত্রার পবিত্র পুণ্যতিথিতে বাংলার আধ্যাত্মিক মানচিত্রে এক অন্যরকম পরিবেশের সাক্ষী থাকল কামারপুকুর। যুগপুরুষ শ্রীরামকৃষ্ণের জন্মভিটে কামারপুকুরে এদিন পালিত হল এক প্রাচীন কৃষি-ঐতিহ্য। শ্রীরামকৃষ্ণ মঠ সংলগ্ন ঐতিহাসিক ‘লক্ষ্মীজলা’ জমিতে মঠের মহারাজ এবং সাধু-সন্ন্যাসীদের অংশগ্রহণে সম্পন্ন হল ধান রোপণ উৎসব। শতবর্ষের এই প্রথা আজও মঠের অন্দরে শ্রীরামকৃষ্ণের পারিবারিক স্মৃতিকে জীবন্ত করে রেখেছে।

এই বিশেষ প্রথাটির পেছনে রয়েছে এক গভীর ঐতিহাসিক ও আবেগঘন কাহিনি। বহু দশক আগে শ্রীরামকৃষ্ণের পিতাকে তাঁর এক বন্ধু লক্ষ্মীজলায় ২ বিঘা জমি উপহার দিয়েছিলেন। সেই সময় থেকেই এই জমিকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছিল ঠাকুরের পরিবারের জীবনধারণের মূল ভিত্তি। শ্রীরামকৃষ্ণের বাবা অত্যন্ত ভক্তিভরে তাঁর আরাধ্য দেবতা ‘রঘুবীর’-কে স্মরণ করে প্রতি বছর রথযাত্রার দিন নিজের হাতে জমিতে প্রথম ধানের চারা রোপণ করতেন। ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের পারিবারিক এই কৃষিনির্ভর জীবনধারা ও রঘুবীরের প্রতি তাঁর নিষ্ঠার প্রতীক হিসেবেই এই প্রথা আজও বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।

পরবর্তীকালে, শ্রীরামকৃষ্ণের তিরোধানের পর কামারপুকুর রামকৃষ্ণ মঠ প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সঙ্গে এই ঐতিহ্যের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন মঠ কর্তৃপক্ষ। সেই পরম্পরা বজায় রেখে প্রতি বছর রথযাত্রার দিন মঠের মহারাজ ও সাধু-সন্ন্যাসীরা সাড়ম্বরে প্রতীকী ধান রোপণ করে থাকেন। এদিনও মঠের প্রাঙ্গণে মহারাজদের নেতৃত্বে সাধুরা ভক্তিভরে এই প্রাচীন প্রথা পালন করেন। মন্ত্রোচ্চারণ ও ভক্তির আবহে যেন এক মুহূর্তের জন্য ফিরে এল শ্রীরামকৃষ্ণের বাল্যকালের সেই কামারপুকুর।

এই দৃশ্য দেখতে এদিন মঠের আশপাশে ভিড় জমান স্থানীয় ভক্ত ও গ্রামবাসী। রথযাত্রার দিন এই ধান রোপণ অনুষ্ঠান কেবল একটি কৃষি আচার নয়, বরং এটি ঠাকুরের পারিবারিক ঐতিহ্যের প্রতি এক গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি। মঠের সন্ন্যাসীরা জানিয়েছেন, যতদিন কামারপুকুর মঠ থাকবে, ততদিন এই ঐতিহ্য অটুট থাকবে। আধুনিকতা ও যান্ত্রিকতার ভিড়ে কামারপুকুরের এই ধান রোপণ উৎসব বাংলার গ্রামীণ সংস্কৃতি ও আধ্যাত্মিক চেতনার এক অনন্য মেলবন্ধন হিসেবে আজও বিদ্যমান। ভক্তদের মতে, রঘুবীরের চরণে নিবেদিত এই ধান রোপণ শ্রীরামকৃষ্ণের সেই অনাড়ম্বর জীবনযাত্রাকে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরে।