পশ্চিম এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার আঁচ এবার সরাসরি পড়ল সাধারণ মানুষের হেঁশেলে। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেল ও এলপিজির দাম অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় রাষ্ট্রায়ত্ত তেল বিপণন সংস্থাগুলোর ওপর চাপ তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতির মোকাবিলায় আজ থেকে রান্নার গ্যাসের (LPG) দাম সিলিন্ডার প্রতি ২৯ টাকা বৃদ্ধি করা হলো। গত তিন মাসের মধ্যে এটি দ্বিতীয়বার দাম বৃদ্ধির ঘটনা। এই মূল্যবৃদ্ধির ফলে দিল্লিতে ১৪.২ কেজির ডোমেস্টিক এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ৯১৩ টাকা থেকে বেড়ে ৯৪২ টাকা হয়েছে। একইভাবে কলকাতায় এই দাম এখন ৯৬৮ টাকায় দাঁড়িয়েছে।
মূল্যবৃদ্ধির কারণ হিসেবে সরকার আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতাকে দায়ী করেছে। ভারতের মোট এলপিজি চাহিদার ৬০ শতাংশেরও বেশি আমদানি করতে হয়। এই আমদানিকৃত গ্যাসের দাম ‘সৌদি কন্ট্রাক্ট প্রাইস’-এর ওপর নির্ভরশীল, যা সৌদি আরামকো নির্ধারণ করে। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, পশ্চিম এশিয়ায় সংকট শুরুর আগে জানুয়ারি মাসে যে এলপিজির দাম টন প্রতি ৫২২ ডলার ছিল, তা এপ্রিল নাগাদ ৭৭৫ ডলারে পৌঁছেছে। অর্থাৎ, আন্তর্জাতিক বাজারে এই পণ্যের দাম প্রায় ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। পেট্রোলিয়াম মন্ত্রকের দাবি, একটি ১৪.২ কেজির সিলিন্ডার সরবরাহের প্রকৃত খরচ এখন প্রায় ১,৬০০ টাকায় পৌঁছেছে।
এই পরিস্থিতিতে চরম ক্ষুব্ধ বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো। কংগ্রেসের অভিযোগ, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের আকাশছোঁয়া দাম এবং জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে দুর্বিষহ করে তুলছে। সরকারের দাবি, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির তীব্র অস্থিরতার সম্পূর্ণ প্রভাব ভোক্তাদের ওপর না চাপিয়ে ভর্তুকির মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হচ্ছে।
তবে সাধারণ গ্রাহকদের জন্য কিছুটা স্বস্তির খবর হলো ‘প্রধানমন্ত্রী উজ্জ্বলা যোজনা’। এই প্রকল্পের সুবিধাভোগীরা সিলিন্ডার প্রতি ৩০০ টাকা সরাসরি ভর্তুকি (ডিবিটি) পাওয়ার পর মাত্র ৬৪২ টাকায় গ্যাস সিলিন্ডার পাচ্ছেন। সরকার জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক মূল্যের নিরিখে ৬৪২ টাকার এই মূল্য প্রায় ৬০ শতাংশ কম। এছাড়া ৫ কেজি সিলিন্ডারের দাম ১০.৫০ টাকা বেড়ে হয়েছে ৩৫৮.৫০ টাকা এবং ১০ কেজির দাম হয়েছে ৬৯১.৫০ টাকা।
তেল কোম্পানিগুলোর আর্থিক অবস্থা বর্তমানে বেশ সংকটজনক। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, প্রতিটি ঘরোয়া সিলিন্ডার বিক্রির ক্ষেত্রে সংস্থাগুলো ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা পর্যন্ত লোকসান বহন করছে। এই আর্থিক বোঝা সামলাতে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা ইতিমধ্যেই তেল বিপণন সংস্থাগুলোর জন্য ৩০,০০০ কোটি টাকার এককালীন ক্ষতিপূরণ প্যাকেজ অনুমোদন করেছে।
উল্লেখ্য, কেবল এলপিজি নয়, জ্বালানির সামগ্রিক দাম বৃদ্ধির প্রভাব পড়ছে অর্থনীতির ওপর। মে মাসের মাঝামাঝি থেকে পেট্রোল ও ডিজেলের দাম প্রতি লিটারে ৭.৫০ টাকা এবং সিএনজি-র দাম কেজিপ্রতি ৬ টাকা বেড়েছে। তা সত্ত্বেও তেল কোম্পানিগুলোকে পেট্রোল বিক্রিতে লিটার প্রতি প্রায় ১১ টাকা এবং ডিজেল বিক্রিতে ৩৩.৬ টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্য স্থিতিশীল না হওয়া পর্যন্ত সাধারণ মানুষকে এই বাড়তি খরচের বোঝা বহন করতে হতে পারে বলেই মনে করছেন অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞরা।





