বাংলার রাজনৈতিক আঙিনায় যখন ‘আদি’ বনাম ‘নব’ তৃণমূলের দ্বন্দ্ব চরমে, ঠিক তখনই রাজ্যসভার সাংসদ বাবুল সুপ্রিয়র একটি ফেসবুক পোস্ট ঘিরে নতুন করে শোরগোল শুরু হয়েছে। দলে নতুন গোষ্ঠী তৈরি হওয়া এবং বিরোধী দলনেতা হিসেবে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্বীকৃতি পাওয়ার পর এই বিতর্ক যেন দাবানলের মতো ছড়িয়েছে। অবশেষে এই বিষয়টি নিয়ে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করলেন বাবুল সুপ্রিয়।
বাবুল সুপ্রিয়ের এই মন্তব্য যে সরাসরি ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের দিকেই তাক করা, তা বুঝতে বাকি নেই রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের। তিনি স্পষ্টভাবে লিখেছেন, “নিজের দলের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার পূর্ণ অধিকার যে কারোরই থাকতে পারে। আমি নিজেও অতীতে সেই পথ বেছে নিয়েছিলাম। কিন্তু, সেই অবস্থানকে যদি সত্যিই সম্মান জানাতে হয়, তবে সাংসদ বা বিধায়ক পদ থেকেও সরে দাঁড়ানো উচিত। কারণ, আপনি তো দলের প্রতীক, নেতৃত্ব এবং ব্যানারের অধীনেই ভোটে লড়ে জিতেছিলেন। দল ছেড়ে বা দলের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে সেই আসন আঁকড়ে থাকা নৈতিকভাবে কতটা যুক্তিসঙ্গত, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।”
শুধুমাত্র ঋতব্রত নয়, এই পোস্টের মাধ্যমে বাবুল সরাসরি মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শাসনকালকেও আক্রমণ করেছেন। তিনি দাবি করেছেন, সরকারি অর্থ তছরুপ এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রথম দিন থেকেই কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত ছিল। বাবুলের কথায়, “দিদি নিশ্চয়ই একটা বড় ভুল করেছিলেন। ক্ষমতায় আসার প্রথম দিন থেকেই যারা দুর্নীতি, সরকারি অর্থ তছরুপ বা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়েছিল, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বদলে অনেকে এখন সেই তথাকথিত ‘৬০’-এর অংশ হয়ে উঠেছে। বাকিদের কেউ ভোটে হেরেছে, কেউ আবার জেলে যাচ্ছে।”
বাবুল সুপ্রিয়ের ক্ষোভের মূল কেন্দ্রে রয়েছে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের হঠাৎ করে দলবিরোধী অবস্থান নেওয়া। তিনি কোনো রাখঢাক না করেই লিখেছেন, “একজন মানুষ আমাকে সবচেয়ে বেশি অবাক করেছে! কখনও ভাবিনি, আমাদের চারপাশে একটা সাপ মানুষের ছদ্মবেশে ঘুরে বেড়াচ্ছিল।” তবে এখানেই থেমে থাকেননি বাবুল। তিনি বিজেপি নেতৃত্বকেও সতর্ক করে দিয়েছেন। তাঁর মতে, অন্য অনেক রাজ্যের মতো বিজেপি যেন ভুল করে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো নেতাদের দলে টেনে না নেয়। রাজনৈতিক মহলের একাংশের ধারণা, দলের সুদিন থাকাকালীন ঋতব্রত যখন নীরব ছিলেন, তখন দলের পরাজয়ের ঠিক পরেই এভাবে অন্দরে বিভাজন তৈরি করা এবং বিদ্রোহ করাকে ভালো চোখে দেখছেন না বাবুল।
পোস্টের শেষে নিজের আগের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে কিছুটা কৌশলী হলেও, তিনি পুরো বিষয়টিকেই নিজের ‘ব্যক্তিগত মতামত’ হিসেবে গণ্য করার আর্জি জানিয়েছেন। বাবুলের এই বিস্ফোরক মন্তব্য তৃণমূল কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতাকে আরও প্রকাশ্যে নিয়ে এল বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। নির্বাচনের পর যেখানে শাসকদল নিজেদের গুছিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে, সেখানে বাবুল সুপ্রিয়ের এই সরাসরি আক্রমণ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখন দেখার, দল বা দলবিরোধী শিবির থেকে এই মন্তব্যের কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া আসে কি না।





