রাজ্যজুড়ে সরকারি প্রকল্পের উপভোক্তা তালিকা নিয়ে শাসক ও বিরোধী শিবিরের তরজা তুঙ্গে। ভুয়ো উপভোক্তার তালিকা থেকে প্রায় ৩০ লক্ষ নাম বাদ পড়তে পারে বলে দাবি করেছেন বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী। এই বিতর্কের মাঝেই একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে আসছে। বিভিন্ন জেলা থেকে একের পর এক ‘লক্ষ্মী ছেলে’র হদিশ মিলছে। মহিলাদের জন্য বরাদ্দ লক্ষ্মীর ভাণ্ডার প্রকল্পের সরকারি অর্থ নিয়ম করে ঢুকছে পুরুষদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে! এবার এমনই এক অবিশ্বাস্য ঘটনার খোঁজ মিলল মালদহ জেলায়।
মালদহের এক ব্যক্তির ব্যাংক অ্যাকাউন্টে দীর্ঘ পাঁচ বছর ধরে নিয়মিত লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের টাকা ঢুকছে। অথচ তিনি এই বিষয়ে সম্পূর্ণ অজ্ঞাত ছিলেন। সরকারি প্রকল্পের টাকা নিজের অ্যাকাউন্টে আসার বিষয়টি শুনে কার্যত অবাক ওই ব্যক্তি। অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে যখন তাঁকে এই বিষয়ে জিজ্ঞেস করা হয়, তখন তিনি হেসে ফেলে জানান, “আপনারা বলছেন তবেই জানলাম। আমি তো জানতামই না যে আমার অ্যাকাউন্টে সরকারি টাকা ঢুকছে।”
রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সামনে আসা এই ঘটনাগুলি নিয়ে তীব্র চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। একদিকে যখন রাজ্যের মহিলারা তাঁদের প্রাপ্য সরকারি অনুদান পাওয়ার জন্য দুয়ারে সরকারের ক্যাম্পে লাইন দিচ্ছেন, অন্যদিকে নিয়ম করে পুরুষদের অ্যাকাউন্টে সেই টাকা জমা হওয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠছে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিয়ে। শুভেন্দু অধিকারীর দাবি, এই ধরনের ঘটনা বিচ্ছিন্ন কিছু নয়, বরং এটি একটি সুসংগঠিত দুর্নীতির অংশ। ৩০ লক্ষের বেশি নাম ভুয়ো উপভোক্তার তালিকায় থাকার আশঙ্কা প্রকাশ করে তিনি প্রশাসনিক অডিট বা নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
অভিযুক্ত ওই ব্যক্তির এই স্বীকারোক্তি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। প্রশ্ন উঠছে, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে কীভাবে টাকা খরচ বা লেনদেন হয়েছে, তা যদি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিই না জানেন? তবে কি তাঁর অজান্তেই অন্য কেউ এই কার্ডের নিয়ন্ত্রণ করছে? নাকি পুরো বিষয়টি ব্যাংক ও প্রশাসনের একাংশের যোগসাজশে ঘটছে? ঘটনায় স্বাভাবিকভাবেই সাধারণ মানুষের মনে ক্ষোভ দানা বাঁধছে। লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের মতো সংবেদনশীল প্রকল্পে এই ধরনের জালিয়াতি সাধারণ মানুষের বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলছে।
প্রশাসনিক আধিকারিকদের একাংশের মতে, এই ধরণের গরমিল সম্ভবত ডেটা এন্ট্রির সময় ভুল বা কারিগরি ত্রুটির কারণে হতে পারে। কিন্তু টানা পাঁচ বছর ধরে কেন এই ভুল সংশোধন করা হলো না, তা নিয়ে কোনো সদুত্তর পাওয়া যায়নি। স্থানীয় মানুষের একাংশের দাবি, শুধুমাত্র ডেটা এন্ট্রির ভুল বলে এটিকে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই, বরং এর পিছনে বড় কোনো চক্র কাজ করছে যা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। মালদহের এই ঘটনার পর থেকে এখন জেলার প্রতিটি ব্লকে উপভোক্তা তালিকায় পুনরায় যাচাইকরণের দাবি উঠেছে। দুর্নীতি আর অব্যবস্থাপনার এই দোলাচলে আসল উপভোক্তারা যেন বঞ্চিত না হন, এখন সেটাই বড় চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।





