শিয়ালদা-বনগাঁ শাখার গোবরডাঙা স্টেশনে সকাল থেকেই চলল চরম নাটকীয়তা। গত কয়েক দশক ধরে স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে গড়ে ওঠা অবৈধ দোকান উচ্ছেদ করতে রেলের বাহিনী বুলডোজার নিয়ে হাজির হতেই স্টেশন চত্বর রণক্ষেত্রে পরিণত হলো। উচ্ছেদের নোটিশ পাওয়ার পর থেকে ব্যবসায়ীদের মধ্যে চাপা উত্তেজনা ছিলই, কিন্তু মঙ্গলবার সকালে যখন অভিযান শুরু হলো, তখন তা চূড়ান্ত রূপ নেয়। হকার ও ব্যবসায়ীরা দাবি করেন, এই দোকানগুলোই তাঁদের একমাত্র রুটিরুজি। এগুলি ভেঙে দিলে তাঁরা অনাহারে মারা যাবেন।
উচ্ছেদের হাত থেকে দোকান বাঁচাতে ব্যবসায়ীরা শেষ পর্যন্ত চরম পথ বেছে নেন। কোনো উপায় না দেখে তাঁরা সটান রেললাইনের ওপর গিয়ে শুয়ে পড়েন। বেশ কয়েকজন প্রবীণ ব্যবসায়ী এবং মহিলাকে রেললাইনে মাথা দিয়ে শুয়ে থাকতে দেখা যায়। তাঁদের একটাই দাবি, “কোনো অবস্থাতেই দোকান ভাঙা যাবে না।” তাঁদের কান্নায় ও চিৎকারে রেল চত্বর ভারী হয়ে ওঠে। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, রেল কর্তৃপক্ষ তাঁদের দীর্ঘদিনের আশ্রয় কেড়ে নিয়ে তাঁদের পেটে লাথি মারছে। পুনর্বাসন ছাড়া এই উচ্ছেদ কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।
গোবরডাঙার এই ঘটনার ঠিক আগেই দমদম জংশন স্টেশনেও একই দৃশ্য দেখা গিয়েছিল। সেখানেও উচ্ছেদের প্রতিবাদে এক মহিলা ব্যবসায়ী রেললাইনে শুয়ে পড়েছিলেন। যদিও রেল কর্তৃপক্ষ সেই সময় বুঝিয়ে বা জোর করে তাঁদের সরিয়ে দেয় এবং বিশাল পুলিশ ও আরপিএফ বাহিনী মোতায়েন করে স্টেশন এলাকাটি দখলমুক্ত করে। সেই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই গোবরডাঙায় আবার একই পরিস্থিতির তৈরি হওয়ায় যাত্রী পরিষেবায় বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। রেল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, স্টেশনের নিরাপত্তা এবং সুষ্ঠু পরিচালনার জন্য অবৈধ দখলদার মুক্ত করা ছাড়া তাদের অন্য কোনো পথ খোলা নেই।
এদিকে, রেল স্টেশনে এই ব্যাপক হকার উচ্ছেদকে কেন্দ্র করে বাংলার রাজনৈতিক পারদ ক্রমশ চড়ছে। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী তথা বর্তমান রাজ্য রাজনীতির অন্যতম প্রধান মুখ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই বিষয়ে বর্তমান ডবল ইঞ্জিন সরকারের কাছে মানবিক হওয়ার আবেদন জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, সাধারণ মানুষের পেটে লাথি মেরে কোনো উন্নয়ন সম্ভব নয়। অন্যদিকে, এই উচ্ছেদের বিরুদ্ধে সরাসরি পথে নেমেছে বাম নেতৃত্ব। হকারদের সঙ্গে নিয়ে স্টেশন চত্বরে লাগাতার বিক্ষোভ দেখাচ্ছেন বামপন্থীরা। তাঁদের সাফ দাবি, পুনর্বাসন বা বিকল্প ব্যবস্থা নিশ্চিত না করা পর্যন্ত কোনোভাবেই উচ্ছেদ অভিযান চালানো যাবে না।
গোবরডাঙা থেকে শুরু করে দমদম—রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তের এই উচ্ছেদ অভিযান একদিকে যেমন আইনি ও প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি করছে, তেমনি এর সাথে জড়িয়ে থাকা কয়েক হাজার মানুষের জীবন-জীবিকার প্রশ্নটিও বড় হয়ে উঠছে। স্টেশন চত্বর দখলমুক্ত করা জরুরি, কিন্তু সেই প্রক্রিয়ায় হকারদের রুটিরুজি কীভাবে সুরক্ষিত থাকবে, সেই প্রশ্নের কোনো সদুত্তর এখনও মিলছে না। রাজনৈতিক চাপানউতোর এবং ব্যবসায়ীদের আন্দোলনের মাঝে দাঁড়িয়ে রেল কর্তৃপক্ষ তাদের সিদ্ধান্তে কতটা অনড় থাকে, এখন সেটাই দেখার।





