ভারতীয় রান্নাঘরে একটি আরশোলা চোখে পড়লে যেখানে আমরা আঁতকে উঠি এবং দ্রুত তা তাড়ানোর চেষ্টা করি, সেখানে বিজ্ঞানীদের সাম্প্রতিক গবেষণা কিন্তু সম্পূর্ণ ভিন্ন এক বার্তা দিচ্ছে। অস্বাস্থ্যকর পতঙ্গ হিসেবে পরিচিত এই আরশোলাই হতে পারে ভবিষ্যতের পুষ্টির এক অভাবনীয় ভাণ্ডার। শুধু প্রোটিন সমৃদ্ধ খাবারই নয়, আরশোলা থেকে তৈরি ‘মিল্ক’ বা দুধ এবং আটা এখন বিশ্বজুড়ে পুষ্টিবিদদের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।
‘ন্যাশনাল লাইব্রেরি অফ মেডিসিন’-এ প্রকাশিত এক চমকপ্রদ তথ্য অনুযায়ী, ‘ডিপ্লোপটেরা পাঙ্কটাটা’ (Diploptera punctata) নামক এক বিশেষ প্রজাতির আরশোলা থেকে নিঃসৃত তরল অত্যন্ত উচ্চমানের পুষ্টিগুণ সম্পন্ন। এই প্রজাতির আরশোলা ডিম পাড়ার পরিবর্তে সরাসরি বাচ্চার জন্ম দেয় এবং তাদের পুষ্টির জন্য এক প্রকার তরল উৎপন্ন করে, যা পরে প্রোটিন ক্রিস্টালে রূপান্তরিত হয়। গবেষকদের দাবি, এই আরশোলার দুধে থাকা প্রোটিন ক্রিস্টালের শক্তি মোষের দুধের তুলনায় প্রায় তিন গুণ বা ৩৭ শতাংশ বেশি। এতে গরু বা মোষের দুধে অনুপস্থিত এমন সব জরুরি উপাদান রয়েছে যা শরীরের জন্য অত্যন্ত উপকারী। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—ওলেইক অ্যাসিড, কনজুগেটেড লিনোলিক অ্যাসিড, ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড এবং প্রয়োজনীয় ভিটামিন ও খনিজ উপাদান।
শুধু দুধ নয়, আরশোলা থেকে তৈরি হচ্ছে আটাও! ব্রাজিলের এক গবেষণায় ‘নওফোয়েটা সিনারিয়া’ (Nauphoeta cinerea) নামের আরশোলা প্রজাতি থেকে তৈরি আটার পুষ্টিগুণ যাচাই করা হয়েছে। সাধারণ গমের আটার তুলনায় এই ‘ইনসেক্ট ফ্লাওয়ার’-এ প্রোটিনের পরিমাণ আকাশচুম্বী। এতে থাকা আটটি অত্যাবশ্যকীয় অ্যামিনো অ্যাসিড এবং ওমেগা-৯ ফ্যাটি অ্যাসিড শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিতে ম্যাজিকের মতো কাজ করে।
প্রোটিনের উৎস হিসেবে আমরা সাধারণত চিকেন বা মাটনকে প্রাধান্য দিই। মার্কিন কৃষি দপ্তরের (USDA) রিপোর্ট অনুযায়ী, ১০০ গ্রাম রোস্টেড মাটনে প্রায় ২৭.১ গ্রাম প্রোটিন থাকে। অথচ বিস্ময়করভাবে আরশোলার শরীরে প্রোটিনের পরিমাণ প্রায় ৭০ শতাংশ! সবথেকে বড় কথা, মাটন বা রেড মিট থেকে শরীরে যে স্যাচুরেটেড ফ্যাটের ঝুঁকি থাকে, আরশোলার প্রোটিনের ক্ষেত্রে সেই ঝুঁকি প্রায় নেই বললেই চলে।
যদিও সাধারণ মানুষের খাদ্য তালিকায় কীটপতঙ্গের অন্তর্ভুক্তি বিষয়টি এখনও বেশ অস্বস্তিকর, কিন্তু ভবিষ্যতের ক্রমবর্ধমান খাদ্য সংকট এবং প্রোটিনের ঘাটতি মেটাতে এই ‘ককরোচ মিল্ক’ এবং ‘ইনসেক্ট ফ্লাওয়ার’ যে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে চলেছে, তা নিয়ে সংশয় নেই বিজ্ঞানীদের। পুষ্টিগুণে ঠাসা এই অখাদ্য পতঙ্গই হয়তো অদূর ভবিষ্যতে মানুষের ডায়েট চার্টের প্রধান উপাদানে পরিণত হবে।





