“ওরা তৃণমূল নয়, বিজেপির স্তাবক!”-ঋতব্রত শিবিরকে নিয়ে কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিস্ফোরক মন্তব্যে উত্তপ্ত রাজ্য রাজনীতি

বিধানসভা নির্বাচনের পর থেকেই বাংলার শাসকদলের অন্দরের সুপ্ত ফাটল এখন সরাসরি জাতীয় রাজনীতিতে প্রবেশ করেছে। ‘আসল’ তৃণমূল কংগ্রেস কারা, তা নিয়ে কালীঘাট বনাম ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় শিবিরের লড়াই এবার রাজ্য সীমানা ছাড়িয়ে একেবারে রাজধানী দিল্লি পর্যন্ত গড়িয়েছে। ভারতের নির্বাচন কমিশনের কাছে দলের নাম এবং বহুল চর্চিত ‘ঘাসফুল’ প্রতীকের দখল পেতে আইনি লড়াই শুরু করার পাশাপাশি, এবার দিল্লিতে পাকাপাকিভাবে একটি স্থায়ী রাজনৈতিক পার্টি অফিস খুলতে চলেছে ঋতব্রত শিবির। সব ঠিকঠাক এগোলে আগামী ২৮ আগস্ট, অর্থাৎ তৃণমূল ছাত্র পরিষদের প্রতিষ্ঠা দিবসের আগেই দিল্লির কনট প্লেস এলাকায় এই নতুন কার্যালয়ের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হতে পারে।

অন্দরের ফাটল থেকে রাজধানীতে আধিপত্যের লড়াই বিধানসভা ভোটের ফল প্রকাশের পর বিরোধী দলনেতা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরে প্রথম বড় ধরনের বিদ্রোহের সূত্রপাত হয়। দলের সর্বোচ্চ নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সিদ্ধান্তের জোরালো বিরোধিতা করে দলীয় বিধায়কদের একটি তাৎপর্যপূর্ণ অংশ দলীয় নেতৃত্ব থেকে নিজেদের আলাদা করে নেন। এই বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সর্বময় নেতৃত্বে উঠে আসেন ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়, যিনি বর্তমানে বিধানসভার বিরোধী দলনেতার গুরুদায়িত্বও সামলাচ্ছেন।

শুরু থেকেই নিজেদেরই ‘আসল’ তৃণমূল বলে জোরালো দাবি করে আসা এই শিবির ইতিমধ্যেই একটি সমান্তরাল জাতীয় কর্মসমিতিও গঠন করেছে। সেই কমিটিতে চেয়ারপার্সন পদ থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে সরিয়ে প্রবীণ নেতা অরূপ রায়কে সেই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে।

দিল্লির স্থায়ী ঠিকানা ও সাংগঠনিক শূন্যস্থান পূরণ দলীয় সূত্রে বিশেষ প্রাপ্ত তথ্যে জানা গেছে, প্রতিষ্ঠার পর থেকে সর্বভারতীয় রাজনৈতিক দল হিসেবে স্বীকৃতি থাকলেও এতদিন পর্যন্ত দিল্লিতে তৃণমূলের নিজস্ব বা স্থায়ী কোনো স্বতন্ত্র কার্যালয় ছিল না। অতীতে মূলত দলীয় সাংসদদের বরাদ্দ করা সরকারি বাংলো বা কোয়ার্টার থেকেই দিল্লির সমস্ত রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কাজকর্ম পরিচালিত হত। তবে সেই অস্থায়ী ব্যবস্থার চিরতরে অবসান ঘটিয়ে এবার রাজধানীতে দলের একটি স্থায়ী ঠিকানা তৈরি করতে মাঠে নেমে পড়েছে ঋতব্রত শিবির। অভিজাত এলাকা কনট প্লেসে কার্যালয়ের জন্য ইতিমধ্যেই পছন্দসই জায়গা চূড়ান্ত করা হয়েছে এবং সেখানে জোরকদমে অন্দরসজ্জার কাজও এগিয়ে চলেছে।

এই বিষয়ে ঋতব্রত শিবিরের নবনিযুক্ত চেয়ারম্যান অরূপ রায় সংবাদমাধ্যমকে জানান, “দিল্লিতে আমাদের একটি স্বতন্ত্র পার্টি অফিস নেওয়া হয়েছে। তবে ঠিক কবে নাগাদ সেটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হবে, তার নির্দিষ্ট দিনক্ষণ এখনও চূড়ান্ত করা হয়নি। আমরা খুব শীঘ্রই আলোচনা করে দিন ঠিক করে সর্বসমক্ষে তা ঘোষণা করব।”

কালীঘাটের কড়া প্রতিক্রিয়া ঋতব্রত শিবিরের এই সমান্তরাল সংগঠন গঠন এবং দিল্লিতে নতুন কার্যালয় তৈরির তোড়জোড়কে প্রথম থেকেই অবশ্য বিন্দুমাত্র গুরুত্ব দিতে নারাজ কালীঘাটপন্থী মূলস্রোতের নেতৃত্ব। এই পুরো বিষয়টিকে কটাক্ষ করে তীব্র ক্ষোভ উগরে দিয়ে দলের প্রবীণ সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় সাফ জানিয়েছেন, “বিজেপির স্তাবক ও দালাল হয়ে অনেক কিছু করা যায়। ঋতব্রত আসলে শুভেন্দুরই আর একটি মুখ। ওরা ভুয়ো, ওরা কোনওভাবেই তৃণমূল কংগ্রেস হতে পারে না।”

সব মিলিয়ে, দলের নাম, প্রতীক এবং নিজেদের রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে আইনি লড়াইয়ের পাশাপাশি রাজধানীর মাটিতেও আধিপত্য বিস্তারের লড়াই এখন চরমে উঠেছে।