ডায়াবেটিসে ভাত-রুটি বন্ধ করা কি আদৌ সঠিক? কার্বোহাইড্রেট নিয়ে যত ভুল ধারণা, বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন!

ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হলেই বহু মানুষ ভাত-রুটি খাওয়া একেবারেই ছেড়ে দেন। তাঁদের ধারণা, কার্বোহাইড্রেট (শর্করা) খেলেই রক্তে শর্করার পরিমাণ দ্রুত বেড়ে যাবে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এমনটি ভাবা মোটেও ঠিক নয়। কারণ কার্বোহাইড্রেটজাতীয় খাবারের মধ্যেও ভালো ও মন্দ রয়েছে। যদি আপনি স্বাস্থ্যকর কার্বস বেছে নেন, তবে তা আপনার শরীরকে শক্তি যোগাবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ডায়াবেটিসে আক্রান্তদের অবশ্যই কম কার্বসযুক্ত পুষ্টিকর খাবার খেতে হবে। তবে দিনে কতটুকু কার্বস গ্রহণ করবেন, তা নির্ভর করবে আপনার ডায়াবেটিস ওঠা-নামার ওপর।
ডায়াবেটিসএভারিডে.কম-এর প্রতিষ্ঠাতা, টবি স্মিথসন (এমএস, আরডিএন, এলডি, সিডিই) বলেন, “কার্বস হলো শর্করা, স্টার্চ এবং ডায়েটরি ফাইবারের উৎস। প্রোটিন এবং ফ্যাটের পাশাপাশি কার্বস আমাদের শরীরের বৃহত্তর পুষ্টি উপাদানগুলোর প্রধান জ্বালানী উত্স হিসেবে কাজ করে।”
🍎 ভালো ও খারাপ কার্বোহাইড্রেট চেনার উপায়
সবচেয়ে ভালো কার্বস: ফল, শাক-সবজি, ব্রাউন রাইস ও হোলগ্রেইন বা গোটা শস্যজাতীয় খাবারে।
ক্ষতিকর বা সরল কার্বস: চিনি, সাদা ভাত, পাউরুটিসহ বিভিন্ন প্রক্রিয়াজাত খাবার শরীরের জন্য ক্ষতিকর, যা দ্রুত রক্তে শর্করার পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়।
💪 কীভাবে কার্বোহাইড্রেট রক্তে শর্করাকে প্রভাবিত করে?
১. গ্লুকোজে রূপান্তর: হজমের সময় কার্বযুক্ত উপাদানগুলোতে থাকা স্টার্চ এবং শর্করা ভেঙে যায়। শরীর বেশিরভাগ কার্বসকে গ্লুকোজ হিসেবে রূপান্তর করে, যা রক্ত প্রবাহে শোষিত হয় এবং শক্তির উত্স হিসেবে কোষ ও টিস্যুতে জমা থাকে। ২. ইনসুলিনের ভূমিকা: খাবারের পর রক্তের গ্লুকোজ বেড়ে গেলে অগ্ন্যাশয় রক্তে ইনসুলিন নিঃসরণ করে। ইনসুলিন চাবি হিসেবে কাজ করে, যার ফলে কোষে সহজে গ্লুকোজ প্রবেশ করতে পারে। ৩. ডায়াবেটিস সমস্যা: যখন কারো ডায়াবেটিস হয়, তখন অগ্ন্যাশয় ইনসুলিন তৈরিতে ব্যর্থ হয় বা ইনসুলিন ঠিকমতো কাজ করে না। ফলে রক্তে শর্করা জমতে শুরু করে।
🎯 দৈনিক কতটুকু কার্বস গ্রহণ করা উচিত?
একাডেমি অব নিউট্রিশন অ্যান্ড ডায়েটেটিক্সের গবেষণা অনুযায়ী, ডায়াবেটিসে আক্রান্ত রোগীদের ক্ষেত্রে প্রতিদিন ১০০-১৫০ গ্রামের মধ্যেই কার্বস রাখা উচিত। তাও ডায়াবেটিসের পরিমাণ অনুযায়ী। যদি আপনার ডায়াবেটিস বাড়তি হয়, তবে কার্বস গ্রহণ আরও কমাতে হবে।
লক্ষ্য রাখুন: কার্বসের উৎস যেন অবশ্যই স্বাস্থ্যকর (বিভিন্ন ফল, শাক-সবজি ও হোলগ্রেইন) হয়। না হলে রক্তে শর্করার পরিমাণ বেড়ে যেতে পারে। প্রয়োজনে আপনি প্রতিদিন কতটুকু কার্বস খাচ্ছেন, তার হিসাব লিখে রাখতে পারেন (যেমন- ১ কাপ রান্না করা ওটমিলে পাওয়া যায় ৩০ গ্রাম কার্বস)।
⚠️ লো-কার্ব ডায়েটের ঝুঁকি ও বিকল্প
অধিক পুষ্টিসম্পন্ন কম কার্বোহাইড্রেট খাবার নির্বাচনের পাশাপাশি সঠিক ডায়েট ও শরীরচর্চা ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য জরুরি। তবে কার্বোহাইড্রেট শক্তির প্রধান উৎস, তাই একে পুরোপুরিভাবে পরিহার করা উচিত নয়।
কিটোজেনিক ডায়েট: খুব কম শর্করা (৫০ গ্রামের কম), উচ্চ ফ্যাটযুক্ত এই ডায়েট ওজন কমায়। তবে এতে কার্বোহাইড্রেট ২০-৩০ গ্রাম পর্যন্তও নেমে আসতে পারে।
‘জিরো কার্ব’ ডায়েট: এই ডায়েটে খাদ্য থেকে সব শর্করা বাদ দেওয়া হয় (সাধারণত প্রাণিজ খাবার অন্তর্ভুক্ত থাকে)। তবে এতে ভিটামিন সি ও ফাইবারের মতো গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টির ঘাটতি হয়। এটি স্বাস্থ্যের জন্য ততটা ভালো নয়।
🛑 অতিরিক্ত লো-কার্ব ডায়েটের বিপদ
কার্বোহাইড্রেট হলো শরীরের প্রাথমিক জ্বালানি, যা পেশি ও মস্তিষ্কের শক্তি জোগায়। লো কার্ব ডায়েটে এর ঘাটতি হলে পেশীর দুর্বলতা, ক্লান্তি, বিভ্রান্তি, মাথা ঘোরা এবং অমনোযোগ দেখা দিতে পারে।
কিটোসিস: শরীরে কার্বোহাইড্রেটের ঘাটতি হলে কিটোসিস হতে পারে। কার্বোহাইড্রেটের অভাবে শরীর যখন ফ্যাট বার্ন করতে শুরু করে, তখন লিভার কিটোন নামের এক ধরনের অম্ল তৈরি করে। অতিরিক্ত কিটোন তৈরি হলে শরীরে সোডিয়াম ও জলের ঘাটতি হয়, যা ক্লান্তি ও শক্তিহীনতা বাড়ায়। সতর্ক না থাকলে এটি জটিল আকার ধারণ করতে পারে।
মনে রাখবেন, আপনি যেভাবেই ডায়েট তৈরি করুন না কেন, তাতে অবশ্যই প্রোটিন, চর্বি এবং শর্করা (স্বাস্থ্যকর উৎস থেকে) থাকতে হবে।