শনিবারের ব্রিগেডে যখন বাংলার প্রথম বিজেপি মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শুভেন্দু অধিকারীর অভিষেক হচ্ছে, তখন সমস্ত আলোকবৃত্ত হঠাতই ঘুরে গেল এক বৃদ্ধের দিকে। মঞ্চে উপস্থিত প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, অমিত শাহ থেকে শুরু করে ২০ জন বিজেপি শাসিত রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী। কিন্তু অনুষ্ঠানের শুরুতেই এক অভাবনীয় দৃশ্যের সাক্ষী থাকল গোটা দেশ। মঞ্চে আসীন এক ৯৮ বছর বয়সী বৃদ্ধের পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করলেন খোদ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। তারপর থেকেই শুরু হয়েছে শোরগোল— কে এই ব্যক্তি যাঁর জন্য প্রোটোকল ভেঙে ঝুঁকে পড়লেন মোদী?
কে এই মাখনলাল সরকার?
শিলিগুড়ির বাসিন্দা, ৯৮ বছর বয়সী মাখনলাল সরকার আদতে বাংলার বিজেপির এক জীবন্ত ইতিহাস। দেশভাগের যন্ত্রণা আর স্বাধীনতার লড়াই— দুটোরই সাক্ষী তিনি। তবে তাঁর সবথেকে বড় পরিচয় হলো, তিনি কিংবদন্তি জননেতা শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সহযোদ্ধা ছিলেন। ১৯৫২ সালে যখন কাশ্মীরে ভারতীয় তেরঙা উত্তোলনের ডাক দিয়েছিলেন শ্যামাপ্রসাদ, সেই ঐতিহাসিক যাত্রায় তাঁর সঙ্গেই ছিলেন মাখনলাল সরকার। পথিমধ্যে পুলিশ তাঁকে গ্রেফতার করলেও দমে যাননি এই জাতীয়তাবাদী নেতা।
বিজেপির সংগঠন যখন শৈশবে…
১৯৮০ সালে যখন ভারতীয় জনতা পার্টি বা বিজেপি তৈরি হয়, তখন উত্তরবঙ্গের মাটি কামড়ে সংগঠনের কাজ শুরু করেছিলেন মাখনলাল বাবু। পশ্চিম দিনাজপুর, জলপাইগুড়ি ও দার্জিলিং জেলায় সমন্বয়কারীর দায়িত্ব পালন করে মাত্র এক বছরের মধ্যে ১০ হাজার সদস্য যুক্ত করেছিলেন তিনি। ১৯৮১ সাল থেকে টানা সাত বছর জেলা সভাপতির দায়িত্ব সামলানো মাখনলাল সরকার দলের কাছে এক ব্যতিক্রমী সাফল্যের নাম।
বিচারকের মন জয় করেছিল গান
বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য মাখনলাল সরকারকে নিয়ে এক রোমহর্ষক কাহিনী শোনান। একবার দেশাত্মবোধক গান গাওয়ার জন্য দিল্লি পুলিশ তাঁকে গ্রেফতার করে। ক্ষমা চাইলে মুক্তির প্রস্তাব দেওয়া হলেও মাখনলাল মাথা নত করেননি। পরে আদালতে বিচারক তাঁকে সেই গানটি গাইতে বলেন। মাখনলাল সরকারের খালি গলার সেই দেশাত্মবোধক গান শুনে বিচারক এতটাই মুগ্ধ হন যে, তৎক্ষণাৎ তাঁকে মুক্তি দেন। শুধু তাই নয়, সসম্মানে ফার্স্ট ক্লাস কামরায় বাড়ি পাঠানোর ব্যবস্থা এবং নগদ ১০০ টাকা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন পুলিশকে।
কেন এই প্রণাম?
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শুভেন্দু অধিকারীর শপথের মঞ্চে মাখনলাল সরকারকে উপস্থিত করা এবং মোদীর তাঁকে প্রণাম করা— আসলে বাংলার পুরনো বিজেপি কর্মীদের সম্মান জানানোরই এক কৌশল। যে আদর্শের ওপর দাঁড়িয়ে আজ বিজেপি বাংলার মসনদে বসল, সেই ইতিহাসের ভিত যে মাখনলালদের মতো প্রবীণদের হাত ধরেই তৈরি হয়েছিল, এদিন মোদীর প্রণাম যেন সেই সত্যেই সিলমোহর দিল।
শপথের এই ‘চাঁদের হাটে’ তাই সবথেকে উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে রইলেন শিলিগুড়ির এই বৃদ্ধ ‘বিপ্লবী’ই।





