বর্ষায় পাহাড় যখন মেঘে ঢাকা, তখন ডুয়ার্স সেজে ওঠে সবুজের এক মায়াবী জাদুতে। সেই সবুজের বিস্ফোরণ যদি নিজের চোখে দেখতে হয়, তবে আপনার গন্তব্য হতে হবে চিলাপাতা। তোর্সা নদীর গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা এই ‘ডিপ ফরেস্ট’ বর্ষায় হয়ে ওঠে মেঘ, কুয়াশা আর বুনো হাতির দেশ। একে বলা হয় ‘ডুয়ার্সের ডার্ক ফরেস্ট’। গা ছমছমে, আদিম আর ভেজা— ঠিক যেন অরণ্যদেবের ডেরা।
কেন বর্ষাতেই বেছে নেবেন চিলাপাতা?
সবুজের সুনামি: বৃষ্টির ছোঁয়ায় জঙ্গল এত ঘন হয় যে দুপুরের কড়া রোদেও বনের ভেতর আঁধার নেমে আসে। ফার্ন, অর্কিড আর মসের রাজত্বে প্রতি ইঞ্চিতে প্রাণের স্পন্দন অনুভব করবেন।
নদী ও বন্যপ্রাণের মেলবন্ধন: তোর্সা, বানিয়া আর কালজানি নদী যখন ফুলে-ফেঁপে ওঠে, তখন বুনো হাতির দল নদীর ধারে জল খেতে বেরিয়ে আসে। বর্ষায় জলের অভাব নেই বলে একশৃঙ্গ গন্ডার, বাইসন বা লেপার্ড দেখার সুযোগ অনেক বেড়ে যায়।
ভিড় কম, সাশ্রয় বেশি: পুজোর ভিড় নেই বলে এই সময়ে হোটেল ও সাফারি বুকিংয়ে প্রায় ৩০ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় মেলে। শান্ত জঙ্গলে পাখির কলতান তখন তিন গুণ বেশি শোনা যায়।
যা না দেখলে আপনার সফর অপূর্ণ:
১. জিপ সাফারি: কোদালবস্তি রেঞ্জ থেকে প্রতিদিন সকাল ৬টা ও বিকেল ৩টেয় ২ ঘণ্টার সাফারি হয়। মেন্দাবাড়ি ও কদমতলা ওয়াচ টাওয়ার থেকে লেপার্ড বা গন্ডার দেখার প্রবল সম্ভাবনা থাকে। জিপ প্রতি খরচ প্রায় ২৫০০-৩০০০ টাকা। ২. নল রাজার গড়: ৫০০ বছরের পুরনো কুচ রাজাদের দুর্গের ধ্বংসাবশেষ। জঙ্গলের মাঝে এই ভাঙা ইটের সুড়ঙ্গ আর গুপ্তধনের লোকগাথা আপনার শরীরে কাঁটা দেবেই। ৩. রাবার গার্ডেন: জঙ্গলের পাশেই সারি সারি রাবার গাছ। বাটিতে কষ জমার দৃশ্য আপনার অ্যালবামের সেরা ছবি হতে পারে।
কীভাবে যাবেন? কোথায় থাকবেন?
ট্রেন: হাওড়া বা শিয়ালদহ থেকে কাঞ্চনকন্যা বা তিস্তা-তোর্সা এক্সপ্রেসে হাসিমারা বা ফালাকাটা স্টেশনে নামুন। সেখান থেকে গাড়ি করে মাত্র ৪৫ মিনিটে পৌঁছে যাবেন চিলাপাতা।
থাকার জায়গা: অ্যাডভেঞ্চার প্রিয় হলে ফরেস্ট ডেভেলপমেন্টের ‘চিলাপাতা জঙ্গল ক্যাম্প’ বা ‘মেন্দাবাড়ি জঙ্গল ক্যাম্প’ সেরা অপশন। খরচ শুরু ২৫০০ টাকা থেকে। বাজেটে ঘুরতে চাইলে কোদালবস্তি হোমস্টে-তে মাত্র ১২০০ টাকায় থাকা ও খাওয়া সম্ভব।
খরচের হিসেব:
২ রাত ৩ দিনের জন্য স্লিপার ক্লাসের টিকিট, শেয়ার গাড়ি, সাফারি ও খাওয়া মিলিয়ে মাথাপিছু খরচ পড়বে প্রায় ৬০০০ টাকা। তবে ৬ জনের গ্রুপে গেলে সেই খরচ ৪৫০০ টাকায় নামিয়ে আনা সম্ভব।
বর্ষায় জঙ্গল ভ্রমণের ৫টি গুরুত্বপূর্ণ টিপস:
১. জোঁক থেকে সাবধান: সাফারিতে নামলে সঙ্গে নুন বা স্যানিটাইজার রাখুন। ফুল প্যান্ট ও স্নিকার্স পরা বাধ্যতামূলক। ২. ক্যামেরা রক্ষা: হিউমিডিটি থেকে লেন্স বাঁচাতে সিলিকা জেল ও রেইন কভার সাথে নিন। ৩. ওষুধ: বমি, জ্বর ও অ্যালার্জির ওষুধের পাশাপাশি ওডোমস বা মশানাশক ক্রিম সাথে রাখুন। ৪. বুকিং: যদিও স্পট বুকিং হয়, তবে ঝামেলা এড়াতে http://wbfdc.net থেকে আগেই বুক করে রাখুন। ৫. জঙ্গলের নিয়ম: হাতি দেখলে চিৎকার করবেন না। বন্যপ্রাণের নিরাপত্তায় ফোন সাইলেন্ট রাখুন এবং গাইডের নির্দেশ মেনে চলুন।
শহরের ধুলোবালি আর স্ট্রেস ধুয়ে ফেলতে এবার বর্ষায় হারিয়ে যান চিলাপাতে। শাল-সেগুনের পাতার ফাঁক দিয়ে যখন বৃষ্টির জল পড়বে আর দূরে হাতির ডাক শুনবেন, মনে হবে আপনি সত্যি ‘বেঁচে আছেন’।





