বিশ্ব যখন অতিমারির স্মৃতি কাটিয়ে স্বাভাবিক ছন্দে ফিরছে, ঠিক তখনই দক্ষিণ আমেরিকার উপকূলে এক প্রমোদতরি বা ক্রুজ শিপে হানা দিল রহস্যময় ‘হান্টাভাইরাস’। আর্জেন্টিনার উশুয়াইয়া থেকে ছেড়ে যাওয়া ‘MV Hondius’ নামের ওই জাহাজে গত কয়েকদিনে এই ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে মৃত্যু হয়েছে ৩ জনের। মে মাসের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত মোট ৮ জন আক্রান্ত হওয়ার খবর মেলায় আন্তর্জাতিক মহলে ছড়িয়েছে তীব্র আতঙ্ক।
হান্টাভাইরাস আসলে কী?
হান্টাভাইরাস কোনো নতুন শত্রু নয়। ১৯৫০-এর দশকে কোরিয়ান যুদ্ধের সময় হান্টান নদীর তীরে প্রথম এই ভাইরাস শনাক্ত হয়েছিল। এটি মূলত ইঁদুর, ছুঁচো এবং কাঠবেড়ালির মতো প্রাণীর মাধ্যমে ছড়ায়। সংক্রমিত প্রাণীর মল, মূত্র বা লালা শুকিয়ে ধুলোর মতো বাতাসে মিশে থাকে। সেই বাতাস নিশ্বাসের মাধ্যমে শরীরে গেলেই মানুষ আক্রান্ত হয়।
ক্রুজ শিপে আতঙ্ক কেন?
সাধারণত হান্টাভাইরাস মানুষ থেকে মানুষে ছড়ায় না। কিন্তু ‘MV Hondius’ ক্রুজ শিপে হানা দিয়েছে এর বিশেষ স্ট্রেইন ‘আন্দিজ ভাইরাস’ (Andes virus)। দক্ষিণ আমেরিকায় পাওয়া এই নির্দিষ্ট প্রজাতিটিই একমাত্র হান্টাভাইরাস, যা অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে এক মানুষ থেকে অন্য মানুষের দেহে সংক্রমিত হতে পারে। আর এই কারণেই প্রমোদতরির বদ্ধ পরিবেশে সংক্রমণ ছড়ানোর ভয় বেশি।
এটি কি দ্বিতীয় কোভিড হতে পারে?
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) শীর্ষকর্তারা অবশ্য এখনই আতঙ্কিত না হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। তাঁদের মতে, হান্টাভাইরাস কোভিডের মতো ভয়াবহ নয়। এর কয়েকটি সুনির্দিষ্ট কারণ রয়েছে:
সংক্রমণের ধরণ: কোভিড সামান্য হাঁচি-কাশিতেই দ্রুত ছড়ায়। হান্টাভাইরাস ছড়াতে গেলে দীর্ঘক্ষণ অত্যন্ত নিবিড় শারীরিক সংস্পর্শ প্রয়োজন।
শরীরে প্রভাব: কোভিড গলার ওপরের অংশে আক্রমণ করে সহজে ছড়ায়। অন্যদিকে হান্টাভাইরাস ফুসফুসের গভীরে আক্রমণ করে, ফলে নিশ্বাসের সাথে ভাইরাস বেরিয়ে আসার হার অনেক কম।
স্থিতিশীলতা: কোভিড বা ফ্লু বারবার রূপ পরিবর্তন (Mutation) করে বলে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। হান্টাভাইরাস তুলনামূলকভাবে শান্ত এবং এর রূপান্তর ক্ষমতা কম।
লক্ষণ ও ভয়াবহতা
প্রাথমিকভাবে জ্বর, প্রচণ্ড ক্লান্তি, পেশিতে ব্যথা এবং মাথাব্যথা দেখা দেয়। কিন্তু পরিস্থিতি গুরুতর হলে ফুসফুসে জল জমে শ্বাসকষ্ট শুরু হয়, যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে ‘হান্টাভাইরাস পালমোনারি সিনড্রোম’ বলা হয়। ২০২৫ সালের পরিসংখ্যানে দেখা গিয়েছে, বিশ্বে ২২৯ জন আক্রান্তের মধ্যে ৫৯ জনের মৃত্যু হয়েছে, যা থেকে স্পষ্ট যে এটি অত্যন্ত প্রাণঘাতী হতে পারে।
ভারতের জন্য সতর্কতা
ভারতে হান্টাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব নেই বললেই চলে। তবে চিকিৎসকদের পরামর্শ, সতর্কতায় কোনো ক্ষতি নেই। ১. বাড়িঘর, বিশেষ করে রান্নাঘর ও ভাঁড়ার ঘর পরিষ্কার রাখুন যাতে ইঁদুর-ছুঁচোর উপদ্রব না হয়। ২. খাবার সবসময় ঢেকে রাখুন। ৩. পাহাড়ি বা গ্রামীণ এলাকায় পরিত্যক্ত ঘরে ঢোকার আগে জানলা-দরজা খুলে হাওয়া চলাচলের ব্যবস্থা করুন।
বিশ্বজুড়ে আতঙ্ক থাকলেও বিজ্ঞানীদের দাবি, সচেতন থাকলে এই ভাইরাসের ঝুঁকি সাধারণ মানুষের জন্য অত্যন্ত কম।





