ফুটবল দুনিয়ায় সুনামি! হোসে মরিনহোর নেটফ্লিক্স ডকুমেন্টারিতে ফাঁস ৫ বিস্ফোরক তথ্য

‘দ্য স্পেশাল ওয়ান’ নামে খ্যাত বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম বিতর্কিত ও সফল কোচ হোসে মরিনহো আবারও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। দ্বিতীয়বারের মতো রিয়াল মাদ্রিদের দায়িত্ব নেওয়া ৬৩ বছর বয়সি এই পর্তুগিজ কিংবদন্তির দীর্ঘ ২৬ বছরের বর্ণাঢ্য কর্মজীবন ও সাফল্যের নানা অজানা গল্প নিয়ে নেটফ্লিক্সে সম্প্রতি মুক্তি পেয়েছে ৩ পর্বের একটি চাঞ্চল্যকর ডকুমেন্টারি সিরিজ। ‘মরিনহো’ নামের এই সিরিজে তাঁর ক্যারিয়ারের বহু লুকোনো এবং বিস্ফোরক তথ্য প্রকাশ্যে এসেছে, যা গোটা ফুটবল বিশ্বে শোরগোল ফেলে দিয়েছে। পরিচালক জোয়েল পার্লম্যান ও ‘ভেঞ্চারল্যান্ড’ (যাঁরা ২০২৩ সালে বিখ্যাত বেকহ্যাম ডকুমেন্টারি তৈরি করেছিলেন) দ্বারা নির্মিত এই সিরিজের ৫টি সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:

১. ইকের ক্যাসিয়াস ও দলের সিনিয়র তারকাদের সঙ্গে চরম বিরোধ:
রিয়াল মাদ্রিদে নিজের প্রথম মেয়াদে (২০১০-২০১৩) ১০০ পয়েন্ট তুলে ঐতিহাসিক লা লিগা জয় করলেও, দলের কিংবদন্তি গোলকিপার ইকের ক্যাসিয়াসের সঙ্গে মরিনহোর সম্পর্ক সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছিল। ডকুমেন্টারিতে মরিনহো দাবি করেছেন যে, ক্যাসিয়াস ক্লাবের অধিনায়ক হওয়ার পর থেকেই অতিরিক্ত ছুটি চাওয়া, অনুশীলনের সময় ইচ্ছাকৃত পিছিয়ে দেওয়া এবং ম্যাচের দিন সরাসরি টিম বাসে না এসে আলাদা পৌঁছানোর মতো দাবি করতে শুরু করেছিলেন, যা দলের মধ্যে এক ধরণের ‘বিলাসী ও অপেশাদার’ সংস্কৃতি তৈরি করছিল। বিশেষ করে, চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী বার্সেলোনা ক্লাবের খেলোয়াড়দের সঙ্গে ক্যাসিয়াসের অতিরিক্ত সখ্যতা মেনে নিতে পারেননি মরিনহো। এ প্রসঙ্গে তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “জাতীয় দলে গিয়ে সতীর্থদের চুমু খাও, তাতে আমার কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু যখন রিয়াল মাদ্রিদ বনাম বার্সেলোনা এল ক্লাসিকো মাঠে গড়াবে, তখন সেটি কেবলই একটি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ।” মরিনহোর এই কঠোর মনোভাবের জেরে ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো ও সার্জিও রামোসের মতো দলের অন্য মেগাতারকারাও একসময় তাঁর বিপক্ষে চলে গিয়েছিলেন।

২. স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসনের অনুরোধ সত্ত্বেও ম্যাঞ্চেস্টার ইউনাইটেডে না যাওয়ার আফসোস:
২০১৩ সালে রিয়াল মাদ্রিদ ছাড়ার পর বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম সফল ম্যানেজার স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসনের উত্তরসূরি হিসেবে ঐতিহ্যবাহী ম্যাঞ্চেস্টার ইউনাইটেডে মরিনহোর যোগ দেওয়া একপ্রকার নিশ্চিতই ছিল। খোদ স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসন এই ডকুমেন্টারিতে জানিয়েছেন যে, মরিনহো প্রথমে ওল্ড ট্রাফোর্ডের প্রস্তাব সানন্দে গ্রহণও করেছিলেন। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে পুরো পরিস্থিতি বদলে যায়। পরবর্তীতে মরিনহো অত্যন্ত আবেগপ্রবণ হয়ে কান্নাকাটি করতে করতে ফার্গুসনকে ফোন করে জানান যে, তিনি ইতিপূর্বেই চেলসি ক্লাবকে কথা দিয়ে ফেলেছেন এবং নিজের সেই কথা কোনোভাবেই ভাঙতে পারবেন না। পরবর্তীতে রিয়ালে নানা বিতর্ক ও কঠিন সময়ের মোকাবিলা করে শেষ পর্যন্ত তিনি চেলসি ক্লাবেই ফিরে যান।

৩. ড্রোন ও প্রযুক্তির গোপন প্রয়োগ এবং খেলোয়াড়দের অন্ধ আনুগত্য:
২০০৪ সালে প্রথমবার চেলসিতে পা রাখার পর থেকেই ম্যাচের নিখুঁত কৌশলগত বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে আধুনিক প্রযুক্তির বিপ্লব ঘটিয়েছিলেন মরিনহো। দলের তৎকালীন অ্যানালিস্ট আন্দ্রে ভিলাস-বোয়াস জানান যে, সেই আদি যুগেও ম্যাচ ভিডিওর ডিভিডি প্লেয়ার বা প্রজেক্টর নষ্ট হলে রেগে আগুন হয়ে তা ভেঙে ফেলতেন মরিনহো। চেলসির সাবেক কিংবদন্তি অধিনায়ক জন টেরি এক সাক্ষাৎকারে শেয়ার করেছেন যে, একবার সমারসেটে প্রতিপক্ষ বোল্টন ওয়ান্ডারার্সের সম্পূর্ণ গোপন অনুশীলন সেশনের ভিডিও প্লে করে মরিনহো তাঁদের এমনভাবে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন যে সবাই অবাক হয়ে গিয়েছিলেন। মরিনহোর ট্যাকটিক্যাল ব্রেন এবং কোচিংয়ের প্রতি খেলোয়াড়দের আনুগত্য এতটাই অগাধ ছিল যে জন টেরি আবেগপ্রবণ হয়ে বলেছিলেন, “তাঁর (মরিনহোর) জন্য আমি কফিনে বন্দী অবস্থায় কবর থেকে উঠে এসেও মাঠে নেমে খেলতে রাজি ছিলাম।”

৪. পেপ গুয়ার্দিওলার ‘সাবেটিকাল’ বা দীর্ঘ বিরতিকে তীব্র কটাক্ষ:
ফুটবল ইতিহাসে পেপ গুয়ার্দিওলা এবং হোসে মরিনহোর মধ্যকার দ্বৈরথ সর্বদা অন্যতম আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে থেকেছে। সম্প্রতি পেপ গুয়ার্দিওলা ম্যাঞ্চেস্টার সিটি ক্লাব থেকে বিদায় নিয়ে সাময়িক বিরতি বা ‘সাবেটিকাল’-এ যাওয়া প্রসঙ্গে মরিনহো অত্যন্ত আক্রমণাত্মক সুরে সমালোচনা করেছেন। তিনি সাফ জানিয়ে দেন, “সাবেটিকাল বা দীর্ঘ ছুটির এই শব্দটাকেই আমি চরম ঘৃণা করি। আমার কাছে এর একটাই মানে, আর তা হলো মানসিক দুর্বলতা। কাজের থেকে দীর্ঘ বিরতি নেওয়া বা বিশ্রামের কোনো প্রয়োজন আমার জীবনে নেই। ওপরওয়ালা যেদিন এই পৃথিবী থেকে ডাক পাঠাবেন, সেদিনই কেবল আমার কোচিং ক্যারিয়ারে ইতি ঘটবে।” সবচেয়ে মজার বিষয় হলো, এই ডকুমেন্টারির নির্মাতারা পেপ গুয়ার্দিওলাকে এতে অংশ নেওয়ার অনুরোধ জানালে তিনি শর্ত রেখেছিলেন যে, খোদ মরিনহোকে ব্যক্তিগতভাবে তাঁকে আমন্ত্রণ জানাতে হবে—যা পর্তুগিজ কোচ কখনোই করেননি।

৫. মালিক আব্রামোভিচের ওপর পুরনো ক্ষোভ ও শেভচেঙ্কো চুক্তি বিতর্ক:
২০০৬ সালে চেলসিতে রেকর্ড অর্থে স্ট্রাইকার আন্দ্রি শেভচেঙ্কোকে সই করানো নিয়ে ক্লাবের তৎকালীন কোটিপতি মালিক রোমান আব্রামোভিচের ওপর মরিনহোর মনে গভীর ক্ষোভ এখনও রয়ে গেছে। মরিনহোর সোজা সাপ্টা দাবি, তৎকালীন মালিক রোমান আব্রামোভিচ ফুটবলের অ আ ক খ কিছুই বুঝতেন না এবং শেভচেঙ্কোর পরিবর্তে তিনি সম্পূর্ণ অন্য ধারার স্ট্রাইকার সামুয়েল এটোকে দলে চেয়েছিলেন। পরবর্তীতে ২০০৯-১০ ফুটবল মরশুমে ইন্টার মিলানের কোচ হিসেবে চেলসিকে উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ থেকে নির্মমভাবে ছিটকে দেওয়ার সেই ঐতিহাসিক স্মৃতি রোমন্থন করে মরিনহো বলেন, “আমি সেদিন রোমান আব্রামোভিচের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলাম, যে একসময় আমাকে বরখাস্ত করেছিল। ফুটবল কোচ, ফুটবলার এবং গ্যালারির লক্ষ লক্ষ সমর্থক ছাড়া বাকি সবাই এই পবিত্র খেলার জগতে আসলে অনধিকার প্রবেশকারী বা অনুপ্রবেশকারী মাত্র।”