রপ্তানি বাড়লেও রেকর্ড ঘাটতি! জুলাই মাসে ভারতের বাণিজ্য ঘাটতি লাফিয়ে বেড়ে কত হলো জানেন?

ভারতের বাণিজ্য খাতের জন্য চলতি বছরের জুলাই মাসটি বেশ কিছু চ্যালেঞ্জিং অর্থনৈতিক পরিস্থিতির সাক্ষী থাকল। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, জুলাই মাসে ভারতের সামগ্রিক পণ্য বাণিজ্য ঘাটতি বা ট্রেড ডেফিসিট উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে প্রায় ৩১.৯৮ বিলিয়ন ডলারে গিয়ে ঠেকেছে। এর আগের মাস অর্থাৎ জুন মাসে এই বাণিজ্য ঘাটতির পরিমাণ ছিল ৩০.৪৩ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ, মাত্র এক মাসের ব্যবধানে দেশের বাণিজ্য ঘাটতি প্রায় ১.৫৫ বিলিয়ন ডলার বৃদ্ধি পেয়েছে। সহজ কথায়, বাণিজ্য ঘাটতি বাড়ার অর্থ হলো বিদেশ থেকে পণ্য আমদানির পেছনে দেশ যত অর্থ ব্যয় করেছে, তার তুলনায় বহির্বিশ্বে পণ্য রপ্তানি করে অর্জিত আয়ের পরিমাণ ছিল অনেক কম। জুলাই মাসে আমদানির গ্রাফ অতিরিক্ত মাত্রায় ঊর্ধ্বমুখী থাকায় এই ব্যবধান আরও বেশি প্রশস্ত হয়েছে।

রয়টার্সের একটি সমীক্ষায় অর্থনীতিবিদরা পূর্বাভাস দিয়েছিলেন যে জুলাই মাসে বাণিজ্য ঘাটতি প্রায় ৩০.২০ বিলিয়ন ডলারের আশেপাশে থাকতে পারে, তবে প্রকৃত পরিসংখ্যান সেই সমস্ত ধারণাকেও ছাড়িয়ে গেছে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, আলোচ্য মাসে ভারতের পণ্য রপ্তানি বৃদ্ধি পেয়ে ৪৪.২৪ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে, যেখানে জুনে এই অংকটি ছিল ৪০.৪১ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ, রপ্তানি খাতের পারফরম্যান্স বেশ ভালো হলেও আমদানির গতি তার চেয়েও অনেক বেশি তীব্র ছিল। জুলাই মাসে ভারতের মোট পণ্য আমদানি রেকর্ড ছুঁয়ে ৭৬.২২ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যা জুনের ৭০.৮৪ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় প্রায় ৫.৩৮ বিলিয়ন ডলার বেশি। রপ্তানি খাতের এই ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও আমদানির এই অস্বাভাবিক উল্লম্ফনের কারণেই বাণিজ্য ঘাটতি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয়নি।

বর্তমানে ভারতের বহির্বিশ্বের বাণিজ্য আন্তর্জাতিক নানা ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে তীব্র চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য সংলগ্ন গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক রুট বা সমুদ্রপথে নানা বাধার কারণে পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে বড় ধরনের জটিলতা তৈরি হয়েছে। শিপিং রুটে এই ধরনের অচলাবস্থা বজায় থাকলে বিশ্ববাজারে ভারতীয় পণ্যের গন্তব্যে পৌঁছানোর সময় এবং পরিবহন খরচ দুই-ই উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যেতে পারে। এর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির চড়া দামও ভারতের আমদানি বিলের ওপর মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করছে। যেহেতু ভারত তার জ্বালানি চাহিদার সিংহভাগই আমদানির মাধ্যমে পূরণ করে, তাই গ্লোবাল মার্কেটে শক্তির মূল্য বাড়লেই দেশের সামগ্রিক আমদানি খরচ হু হু করে বেড়ে যায়।

বাণিজ্য ঘাটতি বেড়ে যাওয়ার অর্থ হলো দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের আয় ব্যয়ের ভারসাম্য নষ্ট হওয়া। দীর্ঘ মেয়াদে এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়তে পারে। ফলে এক দিকে যেমন আন্তর্জাতিক বাজারে ভারতের রপ্তানি ধারাকে শক্তিশালী ও গতিশীল রাখা জরুরি, তেমনই অন্যদিকে আমদানির আকাশছোঁয়া ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করাও বড় অগ্রাধিকার হয়ে দাঁড়িয়েছে। জুলাই মাসের এই পরিসংখ্যান পরিষ্কার করে দিচ্ছে যে রপ্তানি বাড়লেও আমদানির তীব্র গতির কারণে ঘাটতির পাহাড় বড় হয়েছে। আগামী দিনগুলোতে আন্তর্জাতিক শিপিং রুটের পরিস্থিতি, জ্বালানির আন্তর্জাতিক বাজারমূল্য এবং বিশ্বজুড়ে চলমান রাজনৈতিক উত্তেজনা ভারতের বৈদেশিক বাণিজ্যের গতিপ্রকৃতি নির্ধারণে সবচেয়ে বড় নিয়ামক হয়ে উঠবে।