পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনে জয়ের পর সরকার গঠনের চূড়ান্ত প্রস্তুতি শুরু করেছে ভারতীয় জনতা পার্টি। তবে রাজনৈতিক মহলে সবচেয়ে বেশি চর্চা হচ্ছে তাদের শপথগ্রহণের দিনক্ষণ নিয়ে। আগামী ৯ই মে শপথ নিতে চলেছে নতুন মন্ত্রিসভা। কিন্তু কেন এই নির্দিষ্ট দিনটিকেই বেছে নেওয়া হলো? এর নেপথ্যে রয়েছে এক গভীর সাংস্কৃতিক ও আবেগীয় যোগসূত্র। বাংলা পঞ্জিকা অনুসারে এই দিনটি হলো ‘২৫শে বৈশাখ’—বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৬৫তম জন্মজয়ন্তী। বাঙালির আবেগকে ছুঁতে এবং গুরুদেবের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতেই এই বিশেষ দিনটিকে বেছে নিয়েছে বিজেপি নেতৃত্ব।
৭ই মে বনাম ২৫শে বৈশাখ: কেন এই তারিখ বিভ্রাট?
অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে, রবীন্দ্রনাথের জন্ম যদি ১৮৬১ সালের ৭ই মে হয়ে থাকে, তবে কেন ২৫শে বৈশাখ পালন করা হয়? আসলে এর উত্তর লুকিয়ে আছে পঞ্জিকার গণনায়। ইংরেজি বা গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার অনুযায়ী কবির জন্মদিন ৭ই মে, কিন্তু ওই দিনটিতে বাংলা ক্যালেন্ডারে ছিল ১২৬৮ বঙ্গাব্দের ২৫শে বৈশাখ। বাঙালি জাতি চিরকালই তিথি এবং নিজস্ব পঞ্জিকা মেনে উৎসব পালন করতে অভ্যস্ত। তাই আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ৭ই মে গুরুত্ব পেলেও, বাঙালির হৃদয়ে এবং সাংস্কৃতিক উদযাপনে ‘২৫শে বৈশাখ’ এক অবিচ্ছেদ্য নাম।
তারিখ কি প্রতি বছর বদলে যায়?
হ্যাঁ, ইংরেজি ক্যালেন্ডার এবং সৌর পঞ্জিকা ভিত্তিক বাংলা ক্যালেন্ডারের দিন গণনার পদ্ধতি ভিন্ন। এই কারণেই প্রতি বছর ২৫শে বৈশাখ হুবহু ৭ই মে তারিখে পড়ে না। কখনও তা ৮ই মে বা কখনও ৯ই মে হয়। ২০২৬ সালে ২৫শে বৈশাখ পড়েছে ৯ই মে তারিখে। এই গাণিতিক পার্থক্যের কারণেই মূলত তারিখ নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হয়। তবে বাঙালির কাছে ২৫শে বৈশাখ একটি স্থায়ী আবেগ, যা ক্যালেন্ডারের পাতায় নয়, বরং ঐতিহ্যের নিরিখে বিচার্য।
তিন দিনব্যাপী উদযাপনের নেপথ্যে কী কারণ?
ঠাকুর জয়ন্তী কি তিন দিন ধরে পালিত হয়? এই প্রশ্নের উত্তরে বলা যায়, রবীন্দ্রনাথ কেবল একজন ব্যক্তি নন, তিনি একটি প্রতিষ্ঠান। শান্তিনিকেতন থেকে জোড়াসাঁকো—সর্বত্রই তাঁর জন্মজয়ন্তী ঘিরে বিশাল আয়োজন করা হয়। গান, নাচ, কবিতা পাঠ এবং আলোচনা সভার ব্যাপ্তি এতই বেশি যে অনেক সময় অনুষ্ঠান দুই থেকে তিন দিন বা সপ্তাহব্যাপী চলে। এটি জন্মতারিখের বিভ্রান্তি নয়, বরং কবির সৃষ্টির বিশালতাকে উদযাপন করার একটি রীতি। অনেক প্রতিষ্ঠান সুবিধামতো উদ্বোধনী ও সমাপনী অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এই উৎসবকে দীর্ঘায়িত করে।
বিজেপির রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কৌশল
পশ্চিমবঙ্গের মানুষের মনের মণিকোঠায় পৌঁছাতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এক অনিবার্য মাধ্যম। শপথগ্রহণের দিন হিসেবে ২৫শে বৈশাখকে বেছে নেওয়া বিজেপির এক সুচিন্তিত পদক্ষেপ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। একদিকে লাড্ডু বিলি আর জয়ের উল্লাস, অন্যদিকে গুরুদেবের চরণে শ্রদ্ধা নিবেদন—সব মিলিয়ে বাংলার নতুন সরকারের যাত্রা শুরু হতে চলেছে এক অনন্য সাংস্কৃতিক আবহে। বাঙালির নিজস্ব ঐতিহ্যকে মর্যাদা দিয়ে বিজেপি প্রমাণ করতে চাইছে তারা বাংলার সংস্কৃতির প্রকৃত ধারক ও বাহক।





