একসময় ডুয়ার্সের অন্ধকার নামলেই সেবক থেকে মালবাজার—পুরো এলাকা কাঁপত বালিপাথর বোঝাই ডাম্পারের বিকট শব্দে। সেবক, ওদলাবাড়ি, বাগরাকোট থেকে শুরু করে মালবাজার পর্যন্ত নদীর বুক চিরে বালি ও পাথর উত্তোলনের এই কোটি টাকার সাম্রাজ্য বিস্তৃত ছিল দেশের সীমানা ছাড়িয়ে ভুটান ও বাংলাদেশেও। কিন্তু বর্তমানে সেই কর্মচঞ্চল ডুয়ার্স আজ এক অদ্ভুত নীরবতায় মোড়া। বিধানসভা নির্বাচনের আগে প্রশাসনের কড়াকড়ি এবং পরবর্তীতে রাজনৈতিক পালাবদলের পর থেকেই ডুয়ার্সের বালিপাথর উত্তোলনের চাকা পুরোপুরি থমকে গেছে।
রাজ্যে নতুন সরকার গঠনের পর দীর্ঘ সময় পার হয়ে গেলেও এখনও পর্যন্ত বালি-পাথর উত্তোলন বা পরিবহণের বৈধ ছাড়পত্র বা নতুন কোনো দিশা মেলেনি। ফলে বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে থাকা বড় বড় সব ক্রাশার ইউনিট আজ তালাবন্ধ। রাস্তার পাশে দীর্ঘ সারি দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে শত শত ডাম্পার, যা কোনো এক সময় সচল অর্থনীতির প্রতীক ছিল। অথচ এই বিশাল সাম্রাজ্যের নেপথ্যে থাকা মালিক বা রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকদের পরিচয় আজও সাধারণের কাছে ধোঁয়াশায় ঢাকা।
এই পরিস্থিতির সবচেয়ে ভয়াবহ শিকার হয়েছেন খেটে খাওয়া মানুষ। পাথর ভাঙার শ্রমিক, ডাম্পার চালক, খালাসি ও সহকারীর মতো হাজার হাজার পরিবার আজ কার্যত কর্মহীন। দিন আনি দিন খাই মানুষগুলোর সংসারে এখন অভাবের কালো ছায়া। তার ওপর আসন্ন বর্ষার মরশুম আরও বড় বিপদ ডেকে এনেছে। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী, জুন থেকে সেপ্টেম্বর—এই চার মাস নদী থেকে বালি-পাথর উত্তোলন বন্ধ থাকে। ফলে এখনই কাজ শুরু না হলে, শ্রমিকদের আরও অন্তত চার মাস বেকার হয়ে কাটাতে হবে। ইতিমধ্যে বহু তরুণ কাজের সন্ধানে ভিটেমাটি ছেড়ে ভিনরাজ্যে পাড়ি দিয়েছেন।
ওদলাবাড়ির এক তরুণ হতাশ কণ্ঠে বলেন, “সরকার বদলায়, আমাদের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হয় না।” শিববাড়ির ডাম্পার চালক দেবাশিস দাসের আক্ষেপ, “খুব কষ্টে সংসার চলছে, সরকার যদি দ্রুত কোনো ব্যবস্থা না নেয়, তবে পথে বসা ছাড়া উপায় নেই।” একইভাবে খুদিরাম পল্লীর আতুবোহা রায় বা কবিরুন্নেসা বেগমের মতো শ্রমিকদের একটাই হাহাকার—ছেলের পড়াশোনা বন্ধ হওয়ার উপক্রম, দুবেলা দুমুঠো অন্নের সংস্থান করাই এখন দায়।
এই পরিস্থিতিতে মালবাজারের বিজেপি বিধায়ক শুক্রা মুন্ডা পুরনো সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তুলে আশ্বস্ত করেছেন। তিনি বলেন, “তৃণমূল আমলে এই ব্যবসা দুর্নীতির আঁতুড়ঘরে পরিণত হয়েছিল। আমরা দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি নিয়েছি। খেটে খাওয়া মানুষদের বলবো ধৈর্য ধরুন, খুব দ্রুত আইন মেনে সব কিছু আবার চালু করা হবে।” তবে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর শিলিগুড়ি সফরের পরেও এই বিষয়ে কোনো স্পষ্ট প্রশাসনিক রূপরেখা সামনে না আসায় ক্ষোভ বাড়ছে। ডাম্পার মালিকরাও বর্তমানে কোনো ঝুঁকি নিতে নারাজ। ডুয়ার্সের নদী-নির্ভর হাজারো পরিবারের এখন একটাই প্রশ্ন—কবে আবার সচল হবে বালিপাথরের এই চাকা? কবে তাদের ঘরে আবার স্বস্তির ছোঁয়া লাগবে?





