“দিদি, আমাকে বাঁচাও, ওরা আমাকে মেরে ফেলবে!”—ফোনের ওপার থেকে ভেসে আসা এই আর্তনাদই ছিল বীণা কুমারীর শেষ কথা। দিল্লির ইন্দ্রপুরীর এক তিনতলা বাড়ির ছাদ থেকে পড়ে ২৮ বছর বয়সী এই গৃহবধূর মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনায় এখন তোলপাড় রাজধানী। পরিবার ও পুলিশের তথ্যের ব্যবধান মাত্র সাত মিনিটের, যা এই মৃত্যুকে ঘিরে এক গভীর রহস্যের জন্ম দিয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত ১৮ মে রাত ৯টা ৫৫ মিনিটে। বীণা তাঁর দিদি রীনাকে ফোন করে কান্নায় ভেঙে পড়ে জানান, তাঁর ওপর অকথ্য অত্যাচার চলছে এবং তিনি আর বাঁচবেন না। দিদিকে নিজের ছয় মাসের শিশুপুত্রকে আগলে রাখার অনুরোধও করেন তিনি। দিদি রীনা বারবার ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। ঠিক ১০টা ২ মিনিটে বীণার দেওরের ফোন আসে, জানানো হয় বীণা ছাদ থেকে পড়ে গিয়েছেন। মাত্র সাত মিনিটের ব্যবধানে এই ঘটনাকে পরিকল্পিত খুন বলেই দাবি করছেন বীণার পরিবার।
তিন বছর আগে উত্তরপ্রদেশের সম্বলের বাসিন্দা বীণার বিয়ে হয়েছিল রাজু সিংহের সঙ্গে। বিয়ের পর থেকেই পণের দাবিতে শুরু হয় অশান্তি। বীণার ভাইয়ের অভিযোগ, স্বামী রাজু ও দেওর রাজকুমার নিয়মিত পণের জন্য চাপ সৃষ্টি করতেন। বিশেষ করে বিয়ের উপহার হিসেবে পাওয়া ৩২ ইঞ্চির টেলিভিশন নিয়ে দেওর রাজকুমার প্রায়ই কটাক্ষ করতেন। এমনকি, একটি রয়্যাল এনফিল্ড বুলেট মোটরবাইকের দাবিতে বীণার ওপর নিয়মিত শারীরিক নির্যাতন চলত। একবারের মারধরে বীণার কানের পর্দাও ফেটে গিয়েছিল। সব সহ্য করেও বীণা চেয়েছিলেন সংসার টিকিয়ে রাখতে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাঁকে প্রাণ দিতে হলো।
অন্যদিকে, বীণার শ্বশুরবাড়ি সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করেছে। শ্বশুর জয়পাল সিংহ দাবি করেছেন, তাঁরা পণের জন্য কোনো দাবি জানাননি এবং এটি দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যু। তবে তদন্তে নেমে পুলিশ অন্য ইঙ্গিত পেয়েছে। পশ্চিম দিল্লির ডেপুটি কমিশনার অব পুলিশ শরদ ভাস্কর জানিয়েছেন, মৃতার পরিবারের অভিযোগের ভিত্তিতে পণের দাবিতে হত্যার মামলা রুজু করা হয়েছে। পুলিশ ইতিমধ্যে বীণার স্বামী রাজু সিংহ এবং দেওর রাজকুমারকে গ্রেফতার করেছে।
দীনদয়াল উপাধ্যায় হাসপাতালে ময়নাতদন্তের পর বীণার দেহ পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। তদন্তকারীরা এখন খতিয়ে দেখছেন, এটি পরিকল্পিত খুন না কি পরিস্থিতির চাপে বাধ্য হয়ে কোনো চূড়ান্ত পদক্ষেপ। বীণার করা সেই শেষ ফোনকলটি এখন এই মামলার তদন্তের প্রধান সূত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঘটনার নেপথ্যে থাকা নিষ্ঠুরতা এবং পণের অভিশাপ নিয়ে ফের একবার সরব হয়েছে নাগরিক সমাজ। সঠিক বিচার হবে কি না, এখন সেটাই বড় প্রশ্ন।





