“কোথাও খাঁ খাঁ করবে মরুভূমি, কোথাও ডুববে শহর”-যা বলছেন আবহাওয়াবিদরা

মে মাসের চড়া রোদের মাঝেই দেশবাসীর কপালে চিন্তার ভাঁজ বাড়িয়ে দিল ভারতীয় আবহাওয়া দফতর (IMD)। ২০২৬ সালের দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বৃষ্টিপাত বা বর্ষা এবার স্বাভাবিকের তুলনায় অনেকটাই কম হতে পারে। এর নেপথ্যে রয়েছে প্রশান্ত মহাসাগরে তৈরি হওয়া এক ‘সুপার এল নিনো’র (Super El Nino) জোরালো সম্ভাবনা। আইএমডি-র এই সতর্কবার্তা প্রকাশ্যে আসতেই দেশের একাধিক রাজ্যে খরা, চরম জলসংকট এবং কৃষিক্ষেত্রে বড়সড় ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

স্বাভাবিকের নিচে নামবে বৃষ্টির গ্রাফ

আইএমডি-র দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাস অনুযায়ী, জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মৌসুমি বৃষ্টির পরিমাণ দীর্ঘমেয়াদি গড়ের (LPA) মাত্র ৯২ শতাংশে নেমে আসতে পারে। আবহাওয়া বিজ্ঞানের পরিভাষায় যাকে ‘বেলো নর্মাল’ বা স্বাভাবিকের চেয়ে কম বলা হয়। ১৯৭১ থেকে ২০২০ সালের তথ্য অনুযায়ী ভারতে বর্ষা মরসুমের গড় বৃষ্টিপাত প্রায় ৮৭০ মিমি। এবার সেই গ্রাফ অনেকটাই নামার আশঙ্কায় ঘুম উড়ছে প্রশাসনের।

বিপদ বাড়াচ্ছে ‘সুপার এল নিনো’

জলবায়ু বিজ্ঞানীদের মতে, প্রশান্ত মহাসাগরের নিরক্ষীয় অঞ্চলে সমুদ্রের জলের তাপমাত্রা অস্বাভাবিক দ্রুততায় বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর জেরে জুন বা জুলাইয়ের মধ্যেই একটি শক্তিশালী ‘এল নিনো’ পরিস্থিতি তৈরি হতে চলেছে। প্রখ্যাত জলবায়ু বিজ্ঞানী ডঃ মাধবন নায়ারের দাবি, ১৯৯৭ বা ২০১৫ সালের মতো ভয়াবহ ও বিধ্বংসী এল নিনো পরিস্থিতি এবারও দেখা যেতে পারে। সাধারণত এল নিনো সক্রিয় হলে ভারতের মৌসুমি বায়ু দুর্বল হয়ে পড়ে এবং দেশে বৃষ্টির ঘাটতি দেখা দেয়।

সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে কোন কোন এলাকা?

ভারতের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ কৃষিজমি এখনও পুরোপুরি বর্ষার জলের ওপর নির্ভরশীল। ফলে বৃষ্টির ঘাটতি সরাসরি আঘাত করবে খরিফ ফসল উৎপাদনে।

  • উত্তর ও পশ্চিম ভারত: পঞ্জাব, হরিয়ানা এবং রাজস্থানে অগস্ট-সেপ্টেম্বর মাসে বৃষ্টির ঘাটতি ভয়াবহ আকার নিতে পারে।

  • মধ্যপ্রদেশ: ইন্দোর, উজ্জয়িনী, গোয়ালিয়র, চম্বল, জব্বলপুর, রেওয়া, সাগর এবং নর্মদাপুরম এলাকায় খরা সদৃশ পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।

  • অন্যান্য রাজ্য: মহারাষ্ট্র, গুজরাত, ওড়িশা, অন্ধ্রপ্রদেশ এবং কর্ণাটকের খরাপ্রবণ এলাকাগুলোও চরম সংকটে পড়তে পারে। দিল্লি-এনসিআর অঞ্চেও গরম ও শুষ্ক আবহাওয়া দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।

চেন্নাইয়ে আবার বন্যার খাঁড়া!

তবে এল নিনো মানেই যে সব জায়গায় খরা, তা কিন্তু নয়। এর জেরে দক্ষিণ ভারতের কিছু উপকূলীয় অঞ্চলে অতিবৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে তামিলনাড়ুর চেন্নাই এবং অন্ধ্রপ্রদেশের উপকূলে এবার ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির আশঙ্কা করছেন আবহাওয়াবিদেরা। মনে করিয়ে দেওয়া ভালো, ২০১৫ সালের সুপার এল নিনোর সময়েই চেন্নাইয়ে শতাব্দীর অন্যতম ভয়াবহ বন্যা হয়েছিল, যাতে প্রাণ হারিয়েছিলেন বহু মানুষ।

সামান্য আশার আলো ‘আইওডি’

ভয়াবহ এই পূর্বাভাসের মধ্যেও সামান্য আশার আলো দেখাচ্ছেন আবহাওয়াবিদেরা। তাঁদের মতে, মরসুমের শেষের দিকে ভারত মহাসাগরে ‘পজিটিভ ইন্ডিয়ান ওশান ডাইপোল’ (IOD) পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। ভারত মহাসাগরের পশ্চিমাংশের জল উষ্ণ হলে সাধারণত ভারতে ভাল বৃষ্টির সম্ভাবনা বাড়ে। যদি এই পরিস্থিতি ঠিক সময়ে তৈরি হয়, তবে এল নিনোর মরণকামড় কিছুটা হলেও প্রতিহত করা সম্ভব হবে।

আপাতত মে মাসের শেষ সপ্তাহে আইএমডি-র পরবর্তী আপডেটের দিকেই তাকিয়ে রয়েছে গোটা দেশ। তখনই পরিষ্কার হবে, এই সুপার এল নিনো ভারতের জন্য ঠিক কতটা বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে চলেছে।

Related Posts

© 2026 Tips24 - WordPress Theme by WPEnjoy