“১ মাসে ৩ বার রং বদল!”-ঐতিহ্যবাহী অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টসে ‘রঙের রাজনীতি’!

কলকাতার রবীন্দ্র সদন চত্বরের ঐতিহ্যবাহী অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টস এই মুহূর্তে রাজ্য রাজনীতির অন্যতম কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। গত একমাসের মধ্যে এই প্রতিষ্ঠানের দেওয়ালের রং বদল হয়েছে মোট তিনবার। গত মঙ্গলবার নাট্যকর্মী ও শিল্পীদের প্রতিবাদের মুখে পড়ে যখন অ্যাকাডেমি তার পুরনো ও স্বাভাবিক রঙে ফিরেছিল, ঠিক তার ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই ফের ঘটে গেল নাটকীয় পটপরিবর্তন। শিবপুরের বিধায়ক তথা অভিনেতা রুদ্রনীল ঘোষের উপস্থিতি এবং হস্তক্ষেপে বুধবার বিকেলে অ্যাকাডেমির টিকিট কাউন্টার ও তার একাংশে ফের গেরুয়া রঙের প্রলেপ দেওয়া হয়।

কীভাবে শুরু হয়েছিল এই বিতর্ক?

এই পুরো ঘটনার সূত্রপাত গত জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহে। সে সময় অ্যাকাডেমির মূল গেটের পাশে থাকা টিকিট কাউন্টার ঘরটিতে আচমকাই গেরুয়া রং করে দেওয়া হয়। বিষয়টি প্রকাশ্যে আসতেই নাট্যকর্মী ও শিল্পীদের একটি বড় অংশ তীব্র প্রতিবাদে সোচ্চার হন।

তাঁদের প্রধান অভিযোগ ছিল:

  • দীর্ঘদিনের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠানে হঠাৎ এ ধরনের রাজনৈতিক রঙের ব্যবহার অনভিপ্রেত।

  • প্রশাসনের কাছে লিখিত অভিযোগ জানানো হলেও দীর্ঘক্ষণ কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।

প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তায় ক্ষুব্ধ হয়ে শেষ পর্যন্ত শিল্প ও নাট্যজগতের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরাই নিজেরাই মাঠে নামেন। গত মঙ্গলবার ওই ঘরের গেরুয়া রং মুছে তার ওপর সাদা রং করে দেন তাঁরা। শিল্পীদের সাফ কথা ছিল, তাঁদের এই প্রতিবাদ কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে নয়, বরং অ্যাকাডেমির মতো একটি ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব চরিত্র ও নিরপেক্ষ পরিবেশ বজায় রাখার স্বার্থেই এই উদ্যোগ।

রুদ্রনীল ঘোষের উপস্থিতি ও বিতর্কিত মন্তব্য

শিল্পীদের সেই সাদা রঙের প্রলেপ দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। বুধবার বিজেপি বিধায়ক রুদ্রনীল ঘোষ দলীয় কর্মীদের সঙ্গে নিয়ে অ্যাকাডেমি চত্বরে পৌঁছান এবং সেই সাদা রং মুছে পুনরায় গেরুয়া রং করান।

সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে রুদ্রনীল তীব্র ভাষায় আক্রমণ শানিয়ে বলেন, “কী রং ছিল? অ্যাকাডেমির টিকিট কাউন্টার গেরুয়া ছিল। মিথ্য়াচার করে করে এরা পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি থেকে কোণঠাসা হয়ে গেছে। এরা সনাতন ধর্মের বিরোধিতা করে দিকভ্রান্ত হয়ে গেছে… আমরা অ্যাকাডেমির মধ্যে কোনো রাজনীতিকরণ চাই না।” তিনি দাবি করেন, এর আগে যাঁরা সাদা রং করেছিলেন, তাঁরা সিপিএমের হয়ে প্রচার করেন এবং এই ধরনের ধৃষ্টতা মেনে নেওয়া যায় না।

বিজেপি রাজ্য নেতৃত্বের অবস্থান ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব

১৯৩৩ সালে লেডি রানু মুখোপাধ্যায়ের হাতে প্রতিষ্ঠিত ‘অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টস’ বাংলার শিল্প-সংস্কৃতির অন্যতম প্রধান প্রাণকেন্দ্র। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, যামিনী রায়, নন্দলাল বসু ও রামকিঙ্কর বেইজের মতো কিংবদন্তি শিল্পীদের অমূল্য সৃষ্টি এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জড়িত। এই সাংস্কৃতিক পরিসরে রাজনৈতিক রঙের হস্তক্ষেপ মেনে নিতে পারছেন না নাট্য ও শিল্প জগতের বিশিষ্টজনেরা।

এদিকে, স্থানীয় কর্মীদের এই অনমনীয় মনোভাবের বিপরীতে রাজ্য বিজেপি নেতৃত্ব কিছুটা অস্বস্তিতে রয়েছে। দলের শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তারা জানিয়েছেন যে, এই ধরনের অনুমোদনহীন ‘রঙের রাজনীতি’ বা প্রচার কর্মসূচি দলের আনুষ্ঠানিক নীতিমালার পরিপন্থী। এর আগে জুলাই মাসে অ্যাকাডেমির প্রথমবার রং বদলের তীব্র নিন্দা করেছিলেন খোদ রাজ্য বিজেপি সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যও। নিরপেক্ষ সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে এই রাজনৈতিক রং বদলের খেলা আদতে কতটা প্রভাব ফেলে, এখন সেটাই দেখার।