মার্কিন মুলুকে ভারতীয় পরিবারে মর্মান্তিক রক্তপাত! ম্যাসাচুসেটসে ১৭ বছরের ছেলের হাতে খুন মা ও ছোট ভাই

আমেরিকার ম্যাসাচুসেটসের অ্যাক্টন এলাকায় এক মর্মান্তিক ও লোমহর্ষক ঘটনায় বিশ্বজুড়ে প্রবাসী ভারতীয় মহলে চরম চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়েছে। নিজের মা এবং ছোট ভাইকে নির্মমভাবে খুন করার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে এক ১৭ বছরের ভারতীয় বংশোদ্ভূত কিশোরের বিরুদ্ধে। অভিযুক্ত ওই কিশোরের নাম অর্জুন অরবিন্দ, যে স্থানীয় অ্যাক্টন-বক্সবোরো রিজিওনাল হাই স্কুলের একজন ছাত্র। গত মঙ্গলবার রাতে বাড়িতে পুলিশি তল্লাশি শুরু হওয়ার পর দীর্ঘ খোঁজাখুঁজির পর বুধবার ভোরে তাকে অবশেষে পুলিশ গ্রেফতার করে। এই বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের পর মার্কিন আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলি ঘটনার নেপথ্য কারণ উদঘাটনে ব্যাপক তদন্ত শুরু করেছে।

পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, অভিযুক্ত অর্জুনের বিরুদ্ধে তার ৪৫ বছরের মা সুধা ভেঙ্কটেশন এবং ১৪ বছরের ছোট ভাই সিদ্ধার্থ অরবিন্দকে খুন করার অভিযোগে মোট দু’টি সুনির্দিষ্ট খুনের মামলা দায়ের করা হয়েছে। এছাড়াও পরিবারের অন্যান্য সদস্যের উপর হামলা ও মারধরের একাধিক অভিযোগ, বিনা অনুমতিতে গাড়ি ব্যবহার করা এবং গাড়ি চুরির মতো গুরুতর অপরাধের ধারাও তার বিরুদ্ধে যুক্ত করা হয়েছে। গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় অ্যাক্টনের মার্থা লেনের নিজ বাসভবনে এই ভয়ঙ্কর হত্যাকাণ্ডের ঘটনা প্রথম প্রকাশ্যে আসে। প্রতিদিনের নির্ধারিত সময় অনুযায়ী সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা নাগাদ এক গৃহশিক্ষক পড়াতে ওই বাড়িতে পৌঁছন। কিন্তু বহুক্ষণ ধরে কলিং বেল বাজানোর পরও দরজা খুলছিল না এবং বাড়ির কারও সঙ্গেই কোনো যোগাযোগ করা সম্ভব হচ্ছিল না।

পরিস্থিতি সন্দেহজনক ঠেকায় ওই শিক্ষক তৎক্ষণাৎ অর্জুনের বাবার সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তিনিও নিজের স্ত্রী ও সন্তানদের সঙ্গে কোনোভাবেই যোগাযোগ করতে না পারায় চরম উদ্বিগ্ন হয়ে অবিলম্বে পুলিশকে খবর দেন। খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে বাড়িটির দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে এবং সুধা ভেঙ্কটেশন ও সিদ্ধার্থ অরবিন্দকে মৃত অবস্থায় উদ্ধার করে। তদন্তকারী কর্মকর্তাদের দাবি অনুযায়ী, ছোট ভাই সিদ্ধার্থের রক্তাক্ত দেহ বাড়ির প্রথম তলা থেকে উদ্ধার করা হয় এবং মা সুধার দেহটি পাওয়া যায় অন্ধকার বেসমেন্ট থেকে। দুজনের শরীরেই একাধিক আঘাতের গুরুতর চিহ্ন স্পষ্ট ছিল বলে জানিয়েছে পুলিশ। তবে ঠিক কী উপায়ে বা কোন মারণাস্ত্রের সাহায্যে এই নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে, তা ময়নাতদন্ত ও চিফ মেডিক্যাল এগজামিনারের চূড়ান্ত রিপোর্টের আগে নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব হচ্ছে না।

পুলিশ যখন ঘটনাস্থলে পৌঁছায়, তখন অভিযুক্ত অর্জুন বাড়িতে উপস্থিত ছিল না। তদন্তকারীদের প্রাথমিক অনুমান, সে তার মায়ের ব্যক্তিগত ‘হোন্ডা অ্যাকর্ড’ (Honda Accord) গাড়িটি নিয়ে বাড়ি থেকে পালিয়ে যায়। এরপরই পুলিশ প্রশাসন নড়েচড়ে বসে এবং রাজ্যজুড়ে গাড়িটি ও ওই কিশোরের খোঁজে ব্যাপক তল্লাশি শুরু হয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি সাধারণ নাগরিকদেরও ওই কিশোর এবং গাড়িটির বিষয়ে সতর্ক করা হয়। অবশেষে বুধবার ভোরে ওয়েল্যান্ড এলাকার একটি পার্কিং লটে অন্য একটি মামলার তদন্তে গিয়ে পুলিশ ওই হোন্ডা অ্যাকর্ড গাড়িটির সন্ধান পায়। গাড়ির ভেতরেই লুকিয়ে ছিল অর্জুন। পুলিশ সেখানে পৌঁছানোর পর সে কোনো রকম প্রতিরোধ না করায় তাকে অত্যন্ত সুচারুভাবে ও নিরাপদে গ্রেফতার করা হয়।

এই ঘটনার তদন্তে নেমে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ্যে এনেছে মিডলসেক্স কাউন্টি ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির দফতর। তদন্তকারীদের প্রাথমিক দাবি, পরিবারের সদস্যদের এই নৃশংসভাবে খুন করার পরিকল্পনা বা তাত্ত্বিক ধারণা সম্পর্কে ইন্টারনেট এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চ্যাটবট ‘ChatGPT’-তে আগে থেকেই নানা তথ্য খুঁজেছিল অর্জুন। তদন্তকারীদের আরও দাবি, বিভিন্ন ‘গথিক নভেল’-এর মতো কাল্পনিক গল্প তৈরির ক্ষেত্রেও সে ChatGPT-র সাহায্য নিত এবং সেখানে বিভিন্ন কাল্পনিক চরিত্র ও ভয়াবহ পরিস্থিতি নিয়ে নানা প্রশ্ন করেছিল। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এখনই নিশ্চিতভাবে বলতে পারছে না যে এই চ্যাটজিপিটি সার্চই সরাসরি হত্যাকাণ্ডের মূল উদ্দেশ্য বা মোটিভ ছিল কি না। পুরো বিষয়টি এখনও অত্যন্ত সংবেদনশীলভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

ধৃত অর্জুনের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলাগুলি দ্রুত বিচার প্রক্রিয়ার জন্য আদালতে পেশ করা হয়েছে। বুধবার তাকে লোয়েল জুভেনাইল কোর্টে হাজির করার কথা ছিল, তবে যেহেতু ওই আদালতের এই ধরনের গুরুতর খুনের মামলার বিচার করার আইনি এখতিয়ার নেই, তাই খুন এবং সংশ্লিষ্ট হামলার অভিযোগগুলি পরবর্তীতে কনকর্ড ডিস্ট্রিক্ট কোর্টে স্থানান্তরিত হওয়ার কথা রয়েছে। বর্তমানে এই চাঞ্চল্যকর মামলার সার্বিক তদন্তের তদারকি করছেন মিডলসেক্সের ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নি মারিয়ান রায়ান এবং অ্যাক্টন পুলিশের প্রধান ডগলাস স্টারনিওলো। তবে মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে এখনও পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়নি যে এই ভারতীয় পরিবারটি মূলত ভারতের ঠিক কোন রাজ্যের স্থায়ী বাসিন্দা ছিলেন। সুদূর প্রবাসে এমন মর্মান্তিক পারিবারিক হত্যাকাণ্ড ও সন্তানের হাতে মা-ভাই খুন হওয়ার ঘটনায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।