১৮ বছর আগে রাস্তায় কুড়িয়ে পাওয়া কার্তিক-গণেশের নাগরিকত্ব অনিশ্চিত! জন্ম শংসাপত্র পেতে কেন আদালতে দৌড়াতে হচ্ছে?

রাজ্যে ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধন (SIR) প্রক্রিয়া চলার আবহে এবার জন্ম শংসাপত্র (Birth Certificate) জোগাড় করতে রীতিমতো হিমশিম খেতে হচ্ছে কার্তিক ও গণেশ নামের দুই যুবককে। তাদের এই নাগরিকত্বের লড়াই এখন উঠে এসেছে কলকাতা পুরনিগমের অধিবেশনে আলোচনার কেন্দ্রে।
১৮ বছর আগে এই দুই সদ্যোজাতকে শিয়ালদার বউবাজার এলাকার বিবি গাঙ্গুলি স্ট্রিটের একটি রিফিউজি অনাথ আশ্রমে রাস্তার ধারে পড়ে থাকা অবস্থায় পাওয়া গিয়েছিল। সেখানেই বড় হয়ে ওঠা এবং আদর্শ বিদ্যামন্দির থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করা এই দুই তরুণের এখন বয়স ১৮ বছর।
আইনি জটিলতা: নাগরিকত্ব না-পাওয়ার ঘোর অনিশ্চয়তা
নানা কারণে তাদের এখন জন্ম শংসাপত্রের প্রয়োজন, যা হাতে পেলে আইনিভাবেই তারা দেশের নাগরিকত্ব পাবেন। কিন্তু, তাদের কাছে জন্ম শংসাপত্র পাওয়া এখন ‘ঈশ্বর দর্শনের’ সমান হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনাথ আশ্রমের প্রতিষ্ঠাতা আনন্দমোহন বিশ্বাসের পদবি অনুযায়ী কার্তিক বিশ্বাস ও গণেশ বিশ্বাস নাম হলেও, কর্পোরেশনের আইন অনুযায়ী তারা এই শংসাপত্র আদৌ পাবেন কি না, সেই নিয়ে তৈরি হয়েছে ঘোর অনিশ্চয়তা।
সম্প্রতি এই বিষয়ে কলকাতা কর্পোরেশনের অধিবেশনে অনাথ আশ্রমের কর্ণধার ও কাউন্সিলর বিশ্বরূপ দে প্রশ্ন তোলেন।
সুরাহার পথ বাতলালেন ডেপুটি মেয়র
বিশ্বরূপ দে-এর প্রশ্নের উত্তরে ডেপুটি মেয়র অতীন ঘোষ সুরাহার পথ বাতলে দেন:
“চিকিৎসককে একটি শংসাপত্র দিতে হবে। সেটা দেখিয়ে আদালতের কাছে একটি এফিডেভিট কাম অর্ডার করে আনলে, তার ভিত্তিতেই কলকাতা পুরনিগমের স্বাস্থ্য বিভাগ দু’জনের জন্ম শংসাপত্র দেবে।”
পুরনিগম সূত্র জানাচ্ছে, অতীতে রেজিস্ট্রার না-মেনে পথশিশুদের বার্থ সার্টিফিকেট দেওয়ার ফলে জালিয়াতির ঘটনা সামনে এসেছিল। যেখানে কর্তৃপক্ষকে আইনি জটিলতায় পড়তে হয়েছিল। সেই তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকেই কঠোর নির্দেশিকা জারি করা হয়।
চিকিৎসক কেন রাজি নন?
নির্দেশিকা অনুযায়ী, অনাথ শিশুর ক্ষেত্রে চিকিৎসককে একটি সার্টিফিকেট করে দিতে হবে এবং তিনি যেন রেজিস্ট্রারের নিয়ম মেনে কাজ করেন। সেই সার্টিফিকেটই আদালতে এফিডেভিট করে আনলে তবেই জন্ম শংসাপত্র দেওয়া হবে।
কিন্তু, আসল জটিলতা তৈরি হয়েছে এখানেই। কাউন্সিলর বিশ্বরূপ দে বলেন, “মেয়র পারিষদ জানিয়েছেন চিকিৎসককে দিয়ে লিখিয়ে আনতে হবে। কিন্তু, কোনও চিকিৎসক রাজি নন সেই দায়িত্ব নিতে।”
কারণ, যদি পরে পুরনিগম কর্তৃপক্ষের নজরে অন্যায় কিছু আসে, তবে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের কাজ বেআইনি বলে গণ্য হবে এবং তাঁর রেজিস্ট্রেশন বাতিলের জন্য স্বাস্থ্য দফতরকে আবেদন করা হতে পারে। এই আইনি ঝুঁকির কারণেই কেউ দায়িত্ব নিতে চাইছেন না।
নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক এক পুর আধিকারিক বলেন, “জন্ম শংসাপত্র পাওয়া মানে নাগরিকত্বের অধিকার লাভ। এটা অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিষয়। অতীতে আইনি জোটে ফেঁসে যাওয়ার অনেক অভিজ্ঞতা আছে। তাই কলকাতা পুরনিগম নিজেদের উপর আর এই বিষয়ে দায় নেয় না।”
অনাথ আশ্রমের কর্ণধার বিশ্বরূপ দে ফের কলকাতা পুরনিগমের কাছে আবেদন করবেন, যাতে তাদের চিকিৎসককে দিয়েই সার্টিফিকেট করানো যায়।