হাসপাতালের বিছানা থেকে ফেরার আকুল আবেদন! ঝাড়খণ্ডে ছাত্র আন্দোলনের জেরে প্রবল চাপের মুখে হেমন্ত সোরেন সরকার

ঝাড়খণ্ডের পাবলিক সার্ভিস কমিশন (জেপিএসসি) এবং স্টাফ সিলেকশন কমিশন (জেএসএসসি) পরীক্ষার নিয়োগ প্রক্রিয়ায় ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে বিগত বেশ কিছুদিন ধরে চরম অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়েছে গোটা রাজ্যে। এই পরিস্থিতিতে টানা এগারো দিন ধরে আমরণ অনশন চালিয়ে যাচ্ছেন আন্দোলনকারী ছাত্রনেতা প্রেম নায়ক। আন্দোলনের বিশতম দিনে রাঁচির ঐতিহাসিক জয়পাল সিং মুন্ডা স্টেডিয়ামের বিক্ষোভস্থল থেকে হুংকার ছেড়ে প্রেম নায়ক স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন যে, পরীক্ষার্থীদের সমস্ত দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত এই অনশন কর্মসূচি কোনোভাবেই প্রত্যাহার করা হবে না। তাঁর দ্ব্যর্থহীন ঘোষণা, নিজেদের এই যৌক্তিক ও নায্য দাবি আদায়ের জন্য আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা জীবনের ঝুঁকি নিতেও এক মুহূর্তের জন্য পিছপা হবেন না।

সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া বক্তব্যে প্রেম নায়ক আরও উল্লেখ করেন যে, অনশনের ফলে পরিস্থিতি দ্রুত অবনতির দিকে যাচ্ছে এবং চিকিৎসকরা তাঁকে অবিলম্বে অনশন ভেঙে চিকিৎসা শুরু করার পরামর্শ দিচ্ছেন। তা সত্ত্বেও অনশনকারী তথা গোটা আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছাত্রছাত্রীরা তাদের প্রতিবাদ জারি রাখার সিদ্ধান্তে অবিচল রয়েছেন। তাঁর মতে, বর্তমান যে সংকটজনক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তাতে এই লড়াই ছাড়া পিছু হটার কোনো অবকাশ নেই। উল্লেখ্য, গত ১০ আগস্ট রাঁচিতে বিধানসভা ঘেরাও কর্মসূচি চলাকালীন চাকরিপ্রার্থীদের বিশাল মিছিল ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ অতর্কিত লাঠিচার্জ ও জলকামান ব্যবহার করেছিল। সেই সংঘাতের সময়ই ছাত্রনেতা দেবেন্দ্র নাথ মাহাতো সহ বেশ কয়েকজন গুরুতর আহত হন।

পুলিশি বলপ্রয়োগের পর থেকেই পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করে। সোমবার সন্ধ্যায় প্রশাসন জোরপূর্বক অসুস্থ দেবেন্দ্র নাথ মাহাতোকে রাঁচি সদর হাসপাতালে ভর্তি করায়। তবে হাসপাতালের বিছানায় শুয়েও দমে যাননি এই ছাত্রনেতা। সহযোদ্ধাদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে হাসপাতালে দিন কাটানো তাঁর কাছে শারীরিক কষ্টের চেয়েও অনেক বেশি মানসিক যন্ত্রণার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে তিনি সামাজিক মাধ্যমে জানিয়েছেন। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো লিখিত আবেদনে দেবেন্দ্র বিক্ষোভস্থলে ফিরে গিয়ে তাঁর অনির্দিষ্টকালের অনশন কর্মসূচি পুনরায় চালিয়ে যাওয়ার আর্জি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি চিকিৎসকদের সমস্ত নির্দেশ কঠোরভাবে মেনে চলার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন।

অন্যদিকে, এই পুরো ইস্যুতে রাজ্য সরকারকে তীব্র আক্রমণ শানিয়েছেন কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী তথা বিজেপি সাংসদ সঞ্জয় শেঠ। তিনি সরাসরি অভিযোগ করেছেন যে, জেপিএসসি এবং জেএসএসসি পরীক্ষার গোটা প্রক্রিয়ায় প্রায় চারশো কোটি টাকার বিশাল আর্থিক দুর্নীতি সংঘটিত হয়েছে। টিডিপিএল সংস্থার হাত ধরে এই তছরুপ হয়েছে বলে দাবি করে তিনি প্রশ্ন তোলেন যে, এই দুর্নীতিতে ঠিক কাদের কী ভূমিকা ছিল, তার জবাব সরকারকে দিতে হবে। মন্ত্রীর আরও বিস্ফোরক অভিযোগ, রাঁচির ডেপুটি কমিশনার এবং সিনিয়র এসপি সরাসরি প্রতিবাদস্থলে গিয়ে শিক্ষার্থীদের ভয়ভীতি দেখানোর চেষ্টা করেছেন এবং রাতে কৌশলে বিক্ষোভস্থলের বিদ্যুৎ সংযোগ পর্যন্ত বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছিল। শিক্ষার্থীরা নিজেদের উদ্যোগে জেনারেটরের ব্যবস্থা করলেও পুলিশ তা জোর করে সরিয়ে দেয়।

রাজনৈতিক মহলের মতে, এই আন্দোলনকে কেন্দ্র করে ঝাড়খণ্ডের রাজনৈতিক বায়ুমণ্ডল বর্তমানে ভীষণভাবে উত্তপ্ত। হেমন্ত সোরেনের নেতৃত্বাধীন বর্তমান জোট সরকার নিজেদের দলের হেভিওয়েট নেতা ও রাজনৈতিক সহযোগীদের বাঁচানোর উদ্দেশ্যে এই গোটা দুর্নীতির সিবিআই তদন্তের দাবি ধামাচাপা দিতে চাইছে বলে বিরোধী দলগুলির তরফে বারবার অভিযোগ তোলা হচ্ছে। কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর দাবি অনুযায়ী, এই কেলেঙ্কারির সঙ্গে ঝাড়খণ্ড মুক্তি মোর্চা এবং কংগ্রেসের শীর্ষস্থানীয় নেতারা প্রত্যক্ষভাবে জড়িত রয়েছেন বলেই সরকার নিরপেক্ষ তদন্তের মুখোমুখি হতে ভয় পাচ্ছে। চাকরিপ্রার্থীদের একটাই দাবি—অবিলম্বে বিতর্কিত পরীক্ষা বাতিল করে নিরপেক্ষ সিবিআই তদন্ত শুরু করা হোক এবং নিয়োগ ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনা হোক।