সংসদের শেষ দিনে চরম নাটক! অমিত শাহের শর্ত মানতে নারাজ বিরোধীরা, তোলপাড় কৌতূহলী রাজনীতি

ভারতের সংসদের চলতি বর্ষাকালীন বা বাদল অধিবেশনের একেবারে অন্তিম লগ্নে এসে রাজনীতিতে চরম উত্তেজনা ও অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচি অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার সংসদের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নোত্তর পর্বে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। গত মাসে রাজধানী দিল্লির যন্তর মন্তরে একটি রাজনৈতিক সংগঠনের সংসদ অভিযান চলাকালীন সংঘটিত পুলিশি নিপীড়নের তীব্র নিন্দা জানিয়ে এবং সেই বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে স্পষ্ট বিবৃতির দাবি জানিয়ে আসছিল বিরোধী শিবির। শুক্রবার সংসদের এই চলতি বাদল অধিবেশনের সমাপনী দিনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর অধিবেশন কক্ষে জবাব দেওয়ার কথা থাকলেও, বিরোধীরা নিজেদের অবস্থান থেকে সরে এসে নতুন সব দাবি উত্থাপন করেছেন।
বুধবারই কংগ্রেসের প্রবীণ নেতা রাহুল গান্ধী অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছিলেন যে, তাঁরা এখন আর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের দীর্ঘ ভাষণ শুনতে বিন্দুমাত্র আগ্রহী নন। তাঁর মতে, নির্দিষ্ট সময়ে উপযুক্ত জবাব দেওয়া উচিত ছিল, যা তখন দেওয়া হয়নি। এরপর বৃহস্পতিবার সকালে সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেসের পোড়খাওয়া ও প্রবীণ সাংসদ সৌগত রায়ও একই সুর চড়ান। তিনি সংবাদমাধ্যমকে জানান, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে দীর্ঘ বক্তৃতা দেওয়ার সুযোগ করে দেওয়ার কোনো মানসিক বাসনা তাঁদের দলের নেই। দিল্লির ওই ঘটনার সম্পূর্ণ নৈতিক দায় গোটা কেন্দ্রীয় সরকারের ওপর বর্তায়। ফলে সরকারকে আজই স্পষ্ট করে দেশবাসীর সামনে বলতে হবে যে, সেদিন ছাত্র ও সাধারণ মানুষের ওপর পুলিশি বর্বরতা ও বলপ্রয়োগের সুনির্দিষ্ট নির্দেশ ঠিক কার বা কাদের তরফ থেকে দেওয়া হয়েছিল।
এদিকে অধিবেশন শুরু হওয়ার ঠিক প্রাক্কালে সংসদ চত্বরে চরম নাটকীয় পরিবেশের সৃষ্টি হয়। কংগ্রেস সাংসদ পবন খেরার নেতৃত্বে বিরোধী দলগুলির একাংশ একটি প্রতীকী বাঁদরের পুতুল হাতে নিয়ে সংসদ চত্বরে তীব্র স্লোগান দিতে শুরু করেন। তাঁদের কণ্ঠে ধ্বনিত হয়, “৫৬ ইঞ্চি কা ছোট বান্দর, জলদি আও সাদান কে আন্দর।” বিরোধীদের এই অভিনব ও আক্রমণাত্মক প্রতিবাদী কর্মসূচি সংসদ চত্বরে তীব্র চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে।
যদিও গত বুধবার কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ শিক্ষার্থীদের চলমান বিক্ষোভ ও সংঘাতের বিষয়টি নিয়ে অবশেষে নিজের মুখ খুলেছিলেন। তবে তিনি সংসদের ভেতরে কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য না রেখে সংসদ ভবনের বাইরে সংবাদমাধ্যমের সামনে নিজের বক্তব্য পেশ করেন। বিরোধীদের সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানান যে, বিরোধী দলগুলি যদি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে, অর্থাৎ বিকেল তিনটের মধ্যে লোকসভার স্পিকারের কাছে আলোচনার জন্য একটি লিখিত অনুরোধপত্র জমা দেয়, তবে তিনি সমস্ত বিষয়ে খোলামেলা আলোচনা করতে এবং প্রতিটি প্রশ্নের সুনির্দিষ্ট জবাব দিতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছেন।
বর্ষাকালীন অধিবেশনের একেবারে শেষ মুহূর্তে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই শর্তযুক্ত প্রস্তাব তৎক্ষণাৎ সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেন বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী। তিনি পালটা আক্রমণ শানিয়ে বলেন যে, শাহের এহেন ‘কল্পনাপ্রসূত’ ও শর্তযুক্ত কথা শোনার কোনো আগ্রহ বিরোধী জোটের নেই। তারা মূলত একটিমাত্র অতিসংবেদনশীল প্রশ্নের সরাসরি ও স্বচ্ছ উত্তর চায়—গত ২০ জুলাই প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনার প্রতিবাদে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে যন্তর মন্তর থেকে সংসদ ভবন অভিমুখে শান্তিপূর্ণ ছাত্র মিছিলে পুলিশি গুলি চালানোর নির্দেশ কে বা কারা দিয়েছিলেন?
গত বুধবার অমিত শাহ সংসদ ভবনের কক্ষের বাইরে উপস্থিত সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে বিরোধীদের উত্থাপিত সমস্ত অভিযোগ ও পুলিশি গুলিবর্ষণের জবাব দেওয়ার চেষ্টা করেন। পুলিশের কথিত বাড়াবাড়ির দায় নিজের কাঁধ থেকে ঝেড়ে ফেলার এবং সংসদীয় কক্ষ থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখার চেষ্টা করছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী—বিরোধী দলগুলির পক্ষ থেকে এমন তীব্র অভিযোগ করা হয়েছিল। বিরোধীরা তাঁকে উদ্দেশ্য করে ‘লাপাত্তা’ তথা নিখোঁজ এবং ‘ভাগোড়া’ বা পলায়নপর বলে আক্রমণ শানিয়ে স্লোগানও দিয়েছিল। বিরোধীদের এই সমস্ত অবমাননাকর শব্দপ্রয়োগ ও ব্যক্তিগত আক্রমণের তীব্র নিন্দা করে শাহ জানান যে, অধিবেশন শুরু হওয়ার পর থেকেই তিনি নিয়মিত সংসদে আসছেন এবং নিজের দপ্তরেই বসে কাজ করছেন। কিন্তু বিরোধী দলগুলি যদি নিজেরাই সংসদের কোনো কক্ষেই স্বাভাবিক কার্যক্রম ও কাজ চলতে না দেয়, তবে অধিবেশন কক্ষে গিয়ে একা কথা বলে কোনো বিশেষ লাভ হতো না।
বাদল অধিবেশন সমাপ্ত হওয়ার ঠিক আগের দিন বুধবার শাহ অত্যন্ত দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলেছিলেন যে, কেন্দ্রীয় সরকার नीट (NEET) সংক্রান্ত বিক্ষোভ ও জটিলতা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার জন্য বহু আগেই নিজেদের সদর্থক সদিচ্ছা প্রকাশ করেছে। বিরোধী দলগুলি যদি সত্যি বিতর্ক চালাতে আগ্রহী হয়, তবে তাদের উত্থাপিত প্রতিটি আলাদা বিষয়ের ওপর তিনি ব্যক্তিগতভাবে দাঁড়িয়ে জবাব দেবেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, “ওরা আজ বিকেল তিনটের মধ্যে স্পিকারকে একটি আনুষ্ঠানিক চিঠি জমা দিক। আমরা আজ বিকেল তিনটে থেকে আগামীকাল বিকেল তিনটে পর্যন্ত টানা সব দিক নিয়ে আলোচনার জন্য প্রস্তুত রয়েছি। আমি অধিবেশন কক্ষে বসে সবার প্রতিটি অভিযোগ শুনব এবং প্রতিটি বিষয়ের পুঙ্খানুপুঙ্খ জবাব দেব। সরকারের লুকানোর মতো কিছু নেই। বিরোধীদের শুধু সংসদকে তার সাংবিধানিক কাজ অবাধে করতে দিতে হবে।”
তবে পুলিশের বিতর্কিত ভূমিকা ও অভিযানের বিষয়ে সংসদের ফ্লোরে গিয়ে স্বতন্ত্র বিবৃতি দেওয়ার জন্য বিরোধী দলগুলির যে মূল দাবি ছিল, তা এককথায় খারিজ করে দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি যুক্তি দিয়ে বলেন যে, প্রতিষ্ঠিত সংসদীয় পদ্ধতি ও বিধি অনুযায়ী প্রথমে একটি সুস্থ বিতর্ক বা আলোচনা হওয়া উচিত এবং তারপরেই তিনি তার জবাব দেবেন। শাহের এই শর্তসাপেক্ষে জবাব দেওয়ার আকস্মিক ঘোষণায় বিন্দুমাত্র সায় দেয়নি বিরোধী শিবির। তাদের জোরালো বক্তব্য হলো, সংসদের দীর্ঘ ও সমৃদ্ধ ইতিহাস ও ঐতিহ্যের মধ্যে এমন অদ্ভুত শর্তযুক্ত নজির আগে কখনও দেখা যায়নি। বিরোধীরা গোড়া থেকেই একটি পূর্ণাঙ্গ সরকারি বিবৃতির দাবি জানিয়ে আসছিল, কোনো সাধারণ প্রশ্নোত্তর পর্বের দাবি নয়—এমনটাই স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেন সমাজবাদী পার্টির বর্ষীয়ান সাংসদ রামগোপাল যাদব।