হাড়হিম ঠান্ডায় ক্যানসার বধ! কেমোথেরাপির কষ্ট ছাড়াই এবার হবে চিকিৎসা, খরচও কম

ক্যানসার মানেই একরাশ আতঙ্ক, আর তার চেয়েও বড় ভয় কেমোথেরাপির সেই ভয়াবহ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া। চুল পড়ে যাওয়া, অসহ্য বমিভাব আর তীব্র শারীরিক দুর্বলতার দিন এবার শেষ হতে চলেছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের আশীর্বাদ হয়ে ভারতেও এবার এল ‘ক্রায়োঅ্যাবলেশন’ বা ‘ক্রায়োথেরাপি’। সহজ ভাষায় বলতে গেলে, হাড়হিম ঠান্ডায় ক্যানসার কোষকে জমিয়ে বরফ করে মেরে ফেলার এক অত্যাধুনিক অস্ত্র। আমেরিকা ও ইউরোপের পর বর্তমানে ভারতের টাটা মেমোরিয়াল, AIIMS, অ্যাপোলো এবং ফর্টিসের মতো নামী হাসপাতালগুলিতে সফলভাবে এই থেরাপি প্রয়োগ করা হচ্ছে।

কী এই ক্রায়োঅ্যাবলেশন এবং কীভাবে কাজ করে?
‘ক্রায়ো’ শব্দের অর্থ ঠান্ডা এবং ‘অ্যাবলেশন’ মানে ধ্বংস করা। এই পদ্ধতিতে কোনো বড় অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন পড়ে না। সিটি স্ক্যান বা আল্ট্রাসাউন্ডের সাহায্যে টিউমারের ঠিক কেন্দ্রে একটি সরু সুচের মতো যন্ত্র প্রবেশ করানো হয়, যাকে বলা হয় ‘ক্রায়োপ্রোব’। এই প্রোবের ভেতর দিয়ে আর্গন গ্যাস বা লিকুইড নাইট্রোজেন পাঠানো হয়, যার ফলে টিউমারের ভেতরের তাপমাত্রা মুহূর্তের মধ্যে মাইনাস ১৪০ থেকে মাইনাস ১৯০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নেমে যায়। এই প্রচণ্ড ঠান্ডায় টিউমার কোষের ভেতরের জল বরফে পরিণত হয় এবং বরফের ক্রিস্টাল কোষের দেওয়াল ফাটিয়ে দেয়। রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে ১০-১৫ মিনিটের মধ্যেই ক্যানসার কোষের মৃত্যু ঘটে। এরপর প্রোব দিয়ে হিলিয়াম গ্যাস পাঠিয়ে জায়গাটি স্বাভাবিক করা হয়। এই ‘ফ্রিজ-থ’ সাইকেল দু’বার করা হয় যাতে একটিও ক্যানসার কোষ বেঁচে না থাকে। মরা কোষগুলো পরে শরীর নিজেই প্রাকৃতিকভাবে শুষে নেয়।

কেমো বা রেডিয়েশনের চেয়ে কেন সেরা? ৫টি বিশেষ সুবিধা:
১. কাটাছেঁড়া নেই: পুরো প্রক্রিয়াটি মাত্র ২-৩ মিমি ছিদ্র দিয়ে সম্পন্ন হয়। কোনো সেলাই লাগে না, তাই একে ‘মিনিমালি ইনভেসিভ’ বলা হয়।
২. যন্ত্রণা কম: লোকাল অ্যানেস্থেসিয়াতেই কাজ হয়ে যায়। রোগী জেগে থেকে কথা বলতে পারেন এবং ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই বাড়ি ফিরে যেতে পারেন।
৩. পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াহীন: কেমোর মতো চুল পড়ে না বা ইমিউনিটি কমে না। শুধু টিউমার কোষটিই নষ্ট হয়, পাশের সুস্থ কোষের কোনো ক্ষতি হয় না।
৪. পুনরায় প্রয়োগযোগ্য: টিউমার ফিরে এলে রেডিয়েশনের মতো ডোজ লিমিট এখানে নেই, এটি বারবার করা সম্ভব।
৫. সাশ্রয়ী: কেমোর একাধিক সাইকেলের চেয়ে ক্রায়োথেরাপির খরচ তুলনামূলক কম। ভারতে এর খরচ ৮০ হাজার থেকে ২ লক্ষ টাকার মধ্যে।

কোন কোন ক্যানসারে কার্যকরী?
৩ সেমি পর্যন্ত ছোট লিভার টিউমারে এর সাফল্য হার ৯০ শতাংশ। কিডনি ক্যানসারের ক্ষেত্রে ডায়ালিসিসের হাত থেকে বাঁচাতে এটি দারুণ কার্যকরী। এছাড়া ফুসফুস ক্যানসারের প্রাথমিক পর্যায়ে সার্জারির বিকল্প হিসেবে এটি বয়স্কদের জন্য আশীর্বাদ। প্রস্টেট ও ব্রেস্ট ক্যানসারেও ব্রেস্টের আকার নষ্ট না করে টিউমার ধ্বংস করতে এটি ব্যবহার হচ্ছে। হাড়ের ক্যানসারের অসহ্য ব্যথা কমাতেও এই প্রযুক্তি ম্যাজিকের মতো কাজ করে।

তবে ব্লাড ক্যানসার বা ৫ সেমির বড় টিউমারের ক্ষেত্রে এটি প্রযোজ্য নয়। গবেষকদের মতে, এটি শুধু ক্যানসার মারে না, বরং শরীরের ইমিউন সিস্টেমকে বাকি ক্যানসার কোষ চিনে মারতে সাহায্য করে। আগামী ৫ বছরে ক্যানসার চিকিৎসায় এই ‘হাড়হিম’ প্রযুক্তিই হবে প্রধান হাতিয়ার।

Related Posts

© 2026 Tips24 - WordPress Theme by WPEnjoy