হরমুজ প্রণালীতে গোপন করিডোর! উত্তেজনার মধ্যেই তেল পরিবহনে বড় পদক্ষেপ মার্কিন ফৌজের

ইরানের সঙ্গে চলমান চরম ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার এবং যুদ্ধবিরতির মেয়াদ ফুরিয়ে যাওয়ার জেরে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকট যখন ঘনীভূত হচ্ছে, ঠিক তখনই অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে একটি নতুন সামুদ্রিক করিডোর চালু করেছে মার্কিন সামরিক বাহিনী। প্রভাবশালী আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ‘অ্যাক্সিওস’ (Axios)-এর সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে দুজন শীর্ষস্থানীয় মার্কিন কর্মকর্তার বরাতে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ্যে এসেছে। সাম্প্রতিক কূটনৈতিক টানাপোড়েনের পর হরমুজ প্রণালীর মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল জলপথে এই গোপন নৌ-চলাচল পথ খোলার ঘটনা বিশ্ব রাজনীতিতে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।

গত কয়েক সপ্তাহ ধরে অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে এই কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। ওমানের উপকূল ঘেঁষে তৈরি হওয়া একটি সুরক্ষিত দক্ষিণমুখী চ্যানেলের মধ্য দিয়ে প্রতিদিন রাতে প্রায় ১৫ থেকে ২০টি বিশালাকার ট্যাঙ্কার এই প্রণালীতে প্রবেশ করছে এবং নিরাপদে বেরিয়ে যাচ্ছে। মার্কিন কর্তৃপক্ষের দাবি অনুযায়ী, বর্তমানে এই বিশেষ ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি ব্যারেল তেল উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে সরাসরি বিশ্ববাজারে পাঠানো হচ্ছে। যদিও এই পরিমাণটি যুদ্ধের আগের স্বাভাবিক সরবরাহের তুলনায় প্রায় অর্ধেক, তবুও বর্তমান বৈশ্বিক বাজারে জ্বালানির সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এই সম্পূর্ণ সামরিক অভিযানটি কেবল ট্যাঙ্কারগুলোকে পাহারা দিয়ে নিয়ে যাওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; বরং খালি ট্যাঙ্কারগুলোকে আরব সাগর থেকে হরমুজ হয়ে উপসাগরীয় বন্দরগুলোতে তেল সংগ্রহের জন্য নিরাপদে পৌঁছে দেওয়া এবং তেল বোঝাই করার পর পুনরায় প্রণালী পার করে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রেও মার্কিন বাহিনী সরাসরি সহায়তা করছে। নর্থ ক্যারোলিনার ফোর্ট ব্র্যাগে অবস্থিত মার্কিন সেনাবাহিনীর সদর দফতরে গঠিত একটি বিশেষ টাস্ক ফোর্স উপসাগরীয় অঞ্চলের মিত্র দেশগুলির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সমন্বয় রেখে এই পুরো কার্যক্রমটি পরিচালনা করছে। সমস্ত ট্যাঙ্কারকে নির্দিষ্ট সময়সূচির অধীনে সুনির্দিষ্ট কনভয়ে ভাগ করে মার্কিন সামরিক নির্দেশনায় এই দক্ষিণমুখী চ্যানেল ব্যবহার করা হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে ‘ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ড’-এর শক্তিশালী সামরিক অভিযানের ফলে ইরানের রাডার এবং সামুদ্রিক নজরদারি নেটওয়ার্ক মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর ফলেই মার্কিন ফৌজের পক্ষে এই গোপন করিডোর পরিচালনা করা সম্ভব হয়েছে। মার্কিন বিমান বাহিনীর উন্নত নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং আকাশপথে নজরদারির কারণে ইরানের ড্রোন ও ক্রুজ মিসাইলের হুমকিও অনেকাংশে প্রতিহত করা গেছে। যদিও ইরানি বাহিনী এই অঞ্চলের জলপথে সন্দেহভাজন জাহাজগুলোকে লক্ষ্য করে একাধিকবার আক্রমণ চালানোর চেষ্টা করেছে, তবে মার্কিন প্রতিরক্ষাব্যবস্থা মাঝপথেই সেগুলির বেশিরভাগই ধ্বংস বা নিষ্ক্রিয় করে দিয়েছে।

চলমান এই পরিস্থিতির মধ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথটিকে মার্কিন ভূখণ্ড হিসেবে দাবি করে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন। বিশ্বের মোট তেল খরচের প্রায় ২০ শতাংশ এবং এলএনজি (LNG) সরবরাহের মূল ধমনী হিসেবে পরিচিত এই হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে আমেরিকা ও ইরানের এই অদৃশ্য লড়াই আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে গভীর প্রভাব ফেলছে।

Riya Chakrabarty
  • Riya Chakrabarty