সেই ‘অভিশপ্ত’ ৪ অক্টোবর, ৫৭ বছর পর ফিরে এল ১৯৬৮ সালের তিস্তা বন্যার বিভীষিকা, কেন একই দিনে ঘটছে দুর্যোগ?

কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোর ঠিক আগের রাত। তারিখ— ৪ অক্টোবর। বছরটা ১৯৫৮ হলেও, এই একই তারিখে ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি হলো উত্তরবঙ্গ। এবারও সবে দুর্গাপূজা শেষ হয়েছে, কিন্তু অকালবৃষ্টি আর পাহাড়ি নদীর ফুঁসে ওঠায় সবকিছু ওলটপালট। বিশেষ করে তিস্তা ও জলঢাকা নদীর তাণ্ডবে জলপাইগুড়িতে ফিরে এসেছে ৫৭ বছর আগের ১৯৬৮ সালের ভয়াবহ বন্যার স্মৃতি।

৪ অক্টোবর: এক বিভীষিকাময় তারিখ
এই ৪ অক্টোবর তারিখটি জলপাইগুড়ির ইতিহাসে এক ‘অভিশপ্ত’ তারিখ হিসেবে রয়ে গিয়েছে:

বছর তারিখ বিপর্যয়
১৯৬৮ ৪ অক্টোবর রেকর্ড বৃষ্টিতে তিস্তা নদীর বাঁধ ভেঙে জলপাইগুড়িতে বিধ্বংসী বন্যা। সলিলসমাধি হয় কয়েকশো মানুষের।
২০২৩ ৪ অক্টোবর সিকিমের বিধ্বংসী বন্যায় প্রাণহানি। তিস্তা নদীর জলে ভেসে যায় ময়নাগুড়ি, মালবাজার-সহ বিস্তীর্ণ এলাকা।
২০২৫ ৪ অক্টোবর একটানা মুষলধারে বর্ষণে তিস্তা-সহ অন্যান্য পাহাড়ি নদী ফুঁসে ওঠে। জলঢাকার বাঁধ ভেঙে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয় একাধিক গ্রাম।
২০২১ লক্ষ্মীপুজোর আগে একইভাবে তিস্তার জল ফুলে ফেঁপে ওঠে। তিস্তা সেতু সংলগ্ন নদীর বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

Export to Sheets
ফিরে এল ১৯৬৮ সালের স্মৃতি
৫৭ বছর আগে, ১৯৬৮ সালের ৪ অক্টোবর রাতে, রঙধামালিতে তিস্তা নদীর বাঁধ ভেঙে জলপাইগুড়ি শহরে জল ঢুকতে শুরু করে। এবারও একইরকম ভয়ংকর রূপ নেয় ডুয়ার্সের নদীগুলো। জলঢাকা নদীর বাঁধ ভেঙে ধূপগুড়ি ব্লকের বিস্তীর্ণ এলাকা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। জলের তোড়ে পাকা বাড়ি, রাস্তাঘাট, সেতু সব নদীর গ্রাসে চলে গিয়েছে।

জলপাইগুড়ি শহরের প্রবীণ নাগরিক প্রদীপ গঙ্গোপাধ্যায় সেই ১৯৬৮ সালের বিভীষিকাময় স্মৃতির বর্ণনা দিয়ে জানান:

জলের তাণ্ডব: সেবার ভোর ৫টায় উঠে দেখা গিয়েছিল বাড়ির ভেতরে জল ঢুকে গিয়েছে, বিদ্যুৎ নেই। ধীরে ধীরে জল বেড়ে টিনের চাল পর্যন্ত ডুবে যায়। গবাদি পশু, কুকুরের মৃতদেহ করলা নদী দিয়ে ভেসে আসছিল।

যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন: তিস্তার জল হু হু করে শহরে ঢোকে এবং একরাতেই হামিক পাড়া, সেন পাড়া-সহ বিভিন্ন এলাকা ডুবে যায়। করলা নদীর উপর একটিও সেতু ছিল না, সব উড়ে গিয়েছিল। পরে সেনাবাহিনী চলাচলের জন্য ব্রিজ বানিয়ে দেয়।

ত্রাণ: বন্যার পর প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধি জলপাইগুড়িতে পরিস্থিতি পরিদর্শনে আসেন। শিলিগুড়ি থেকে প্রচুর মানুষ নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস নিয়ে জলপাইগুড়িতে এসেছিলেন।

১৯৬৮ সালের বন্যায় যাঁরা প্রাণ হারিয়েছিলেন, তাঁদের স্মৃতির উদ্দেশে পরবর্তীতে করলা নদীর উপর করলা সেতু তৈরি করা হয়েছিল।

২০২৩ সালের সেনা বিপর্যয়
২০২৩ সালের ৪ অক্টোবরে সিকিমের বিধ্বংসী বন্যার ফলে সেনাবাহিনীর ক্যাম্প নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় এবং ৩২ জন জওয়ান তিস্তা নদীর জলে ভেসে গিয়েছিলেন। তিস্তার জলে ভেসে এসেছিল মর্টার শেল-সহ যুদ্ধের সরঞ্জামও।

বারবার একই তারিখে এই ধরনের ভয়াবহ দুর্যোগ উত্তরবঙ্গের মানুষের মনে এক গভীর আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে।