সমুদ্রের সুরক্ষায় ভারতীয় নৌবাহিনীতে আসছে নতুন ব্রক্ষ্মাস্ত্র! কী এই যুদ্ধজাহাজ ‘শ্রুতি’?

ভারতের জলসীমার নিরাপত্তা আরও সুদৃঢ় করতে এবং সামুদ্রিক নজরদারি ব্যবস্থাকে এক অন্য উচ্চতায় নিয়ে যেতে ভারতীয় নৌবাহিনীতে যুক্ত হতে চলেছে আরও একটি অত্যাধুনিক ‘নেক্সট জেনারেশন’-এর যুদ্ধজাহাজ। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর নির্মিত এই বিশেষ যুদ্ধজাহাজটির নাম রাখা হয়েছে ‘শ্রুতি’ (Shruti)। দেশের অন্যতম খ্যাতনামা প্রতিরক্ষা প্রস্তুতকারক সংস্থা গার্ডেনরিচ শিপবিল্ডার্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ার্স (GRSE)-এর তত্ত্বাবধানে এই জাহাজটির নির্মাণকাজ এগিয়ে চলেছে। প্রায় তিন হাজার টন ওজনের এই অফশোর প্যাট্রল ভেসেল বা এনজিওপিভি (NGOPV) প্রকল্পটির আওতায় ভারতীয় নৌবাহিনীর সামুদ্রিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করার জন্য একাধিক শক্তিশালী যুদ্ধজাহাজ তৈরি করা হচ্ছে। এই অত্যাধুনিক যুদ্ধজাহাজগুলির নকশা এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যাতে এগুলো প্রতিকূল আবহাওয়াতেও দীর্ঘ সময় সমুদ্রে অবিরাম টিকে থাকতে পারে, উন্নত নজরদারির মাধ্যমে দেশের সামুদ্রিক সীমানা সুরক্ষিত রাখতে পারে এবং যেকোনো জটিল সামুদ্রিক নিরাপত্তা অভিযানে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে অংশগ্রহণ করতে পারে।

সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন আসতেই পারে যে, এই ‘শ্রুতি’ যুদ্ধজাহাজটি ঠিক কী ধরনের কাজ করবে এবং এর মূল ভূমিকা কী হবে? প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, এই আধুনিক ভেসেলটি ভারতের বিস্তীর্ণ উপকূলীয় ও গভীর সমুদ্র এলাকায় নিয়মিত টহলদারি চালাবে এবং সমুদ্রের বুকে যেকোনো সন্দেহজনক জলযান ও গতিবিধির ওপর তীক্ষ্ণ নজর রাখবে। বর্তমান সময়ে জলদস্যু দমন, চোরাচালান রোধ এবং অন্যান্য সমস্ত ধরনের বেআইনি সামুদ্রিক কার্যকলাপ প্রতিরোধ করার ক্ষেত্রে এই ধরনের যুদ্ধজাহাজ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করে থাকে। এছাড়া দেশের সমুদ্রের তলদেশে থাকা তেল-গ্যাস উত্তোলনের ক্ষেত্র এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পরিকাঠামোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য এই ভেসেলটিকে কৌশলগতভাবে মোতায়েন করা যেতে পারে। সমুদ্রে কোনো কারণে কোনো জাহাজ দুর্ঘটনায় পড়লে বা সাধারণ মানুষ বিপদে পড়লে, তাদের দ্রুত উদ্ধার করার কাজেও এই জাহাজটিকে সমানভাবে ব্যবহার করা সম্ভব হবে। এর শক্তিশালী রাডার এবং অত্যাধুনিক সেন্সরগুলির মাধ্যমে সমুদ্রপথে চলাচলকারী বিভিন্ন জাহাজের লাইভ গতিবিধি নিখুঁতভাবে পর্যবেক্ষণ করা যাবে, যার ফলে ভারতীয় নৌবাহিনী সার্বিক সামুদ্রিক পরিস্থিতির পুঙ্খানুপুঙ্খ তথ্য খুব সহজেই সংগ্রহ করতে পারবে। শুধু তা-ই নয়, বঙ্গোপসাগর বা ভারত মহাসাগরে আছড়ে পড়া কোনো প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় কিংবা অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় উপকূলবর্তী অঞ্চলে উদ্ধার ও ত্রাণ কার্য পরিচালনা করার ক্ষেত্রেও এটি নৌবাহিনীকে দারুণভাবে সহায়তা করবে।

অনেকেই প্রশ্ন তুলতে পারেন যে এটি একটি যুদ্ধজাহাজ হওয়া সত্ত্বেও এর মূল কাজের পরিধি ঠিক কী ধরনের? বিশেষজ্ঞদের স্পষ্ট মত, ‘শ্রুতি’-কে সরাসরি কোনো ভারী ফ্রিগেট বা ডেস্ট্রয়ার যুদ্ধজাহাজের সঙ্গে তুলনা করা একদমই ঠিক হবে না। একটি নেক্সট জেনারেশন অফশোর প্যাট্রল ভেসেলের (NGOPV) মূল দর্শন বা কর্মপদ্ধতি সম্পূর্ণ আলাদা; এদের মূল কাজ হলো সুদীর্ঘ সময় ধরে সমুদ্রে অবস্থান করে নিরবচ্ছিন্ন নজরদারি চালানো এবং সামুদ্রিক নিরাপত্তা বজায় রাখা। তবে যেকোনো জরুরি পরিস্থিতিতে এটি ভারতীয় নৌবাহিনীর সামরিক অভিযানের একটি শক্তিশালী অংশ হিসেবেও সমান দক্ষতায় কাজ করতে সম্পূর্ণ সক্ষম। মূলত, ‘শ্রুতি’ হলো আমাদের দেশের সমুদ্রের দীর্ঘক্ষণের এবং বিশ্বস্ত এক নিরাপত্তা প্রহরী। দেশের বিশাল সমুদ্রসীমা ২৪ ঘণ্টা নজরে রাখা থেকে শুরু করে জলদস্যুদের দমন করা, সংকটে পড়া মানুষকে উদ্ধার করা এবং দেশের গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক স্থাপনাগুলির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা—এই সমস্ত বহুমুখী দায়িত্ব পালনের জন্যই এই ধরনের এনজিওপিভি অত্যন্ত নিখুঁতভাবে তৈরি করা হচ্ছে।