শিবের মন থেকে জন্ম! কেন নাগদেবী মনসার পুজো করলে দূর হয় সর্পভয়?

হিন্দুধর্মে দেবী মনসার পূজা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও মর্যাদাপূর্ণ স্থান অধিকার করে আছে। তিনি মূলত সর্পদেবী এবং সাপের অধিষ্ঠাত্রী দেবী হিসেবে পূজিত হন। পৌরাণিক বিশ্বাস অনুযায়ী, দেবী মনসা হলেন দেবাদিদেব মহাদেবের মানসিক কন্যা। অর্থাৎ, তিনি সাধারণ মায়ের গর্ভ থেকে জন্মগ্রহণ করেননি, বরং ভগবান শিবের মনের এক গভীর পবিত্র সংকল্প বা ‘মানস’ থেকে তাঁর উদ্ভব হয়েছিল। এই বিশেষ জন্মবৃত্তান্তের জন্যই তাঁর নাম রাখা হয় ‘মনসা’ এবং তাঁকে মহাদেবের কন্যা হিসেবে শ্রদ্ধাভরে পূজা করা হয়। সনাতন ধর্মে বিশ্বাস করা হয় যে, মনসা দেবীর আরাধনা করলে ভক্তদের সর্পভয় চিরতরে দূর হয় এবং পরিবারে সুখ, শান্তি ও সমৃদ্ধির ধারা অব্যাহত থাকে।
পৌরাণিক শাস্ত্রে দেবী মনসার জন্মরহস্য সম্পর্কে নানা চিত্তাকর্ষক কাহিনী প্রচলিত রয়েছে। একটি জনপ্রিয় কিংবদন্তি অনুসারে, ভগবান শিব যখন গভীর ধ্যানে মগ্ন ছিলেন, তখন তাঁর অন্তরে এক দিব্য শক্তির সংকল্প জাগ্রত হয়। এই মানসিক সংকল্প থেকেই এক জ্যোতির্ময়ী দেবীর রূপ ধারণ করে জন্ম নেন মনসা। যেহেতু তিনি শিবের মন থেকে আত্মপ্রকাশ করেছিলেন, তাই তাঁকে ‘মানসকন্যা’ বলা হয়। এই অনন্য যোগসূত্রের কারণেই হিন্দুধর্মে তাঁকে শিবের কন্যা হিসেবে মান্যতা দিয়ে পূজা করা হয়।
মা মনসাকে প্রধানত সর্পদেবী ও সর্পকূলের রক্ষাকর্ত্রী হিসেবে গণ্য করা হয়। বিশেষ করে গ্রামীণ জনপদে এবং পূর্ব ভারতে মা মনসার পূজার বিশেষ প্রচলন ও মাহাত্ম্য রয়েছে। ভক্তদের বিশ্বাস, মা মনসার অসীম কৃপা সর্পদংশনের আশঙ্কা এবং সাপের প্রতি তীব্র ভীতি থেকে রক্ষা করে। তবে তিনি কেবল সর্পদেবীই নন, বরং সন্তানলাভ, পারিবারিক সুখ, সমৃদ্ধি এবং সার্বিক মঙ্গলের প্রতীক হিসেবেও পূজিত হন।
মা মনসার সঙ্গে সাপের এই গভীর সংযোগ তাঁর ধর্মীয় পরিচয়ের মূল ভিত্তি। পৌরাণিক আখ্যানে তাঁকে সর্পদের নিয়ন্ত্রক ও অধিষ্ঠাত্রী হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। তাঁর ঐতিহ্যবাহী মূর্তিতে প্রায়শই তাঁর চারপাশ ঘিরে থাকা সাপ চিত্রিত করা হয়। প্রাচীনকাল থেকেই গ্রামাঞ্চলে সার্পদংশনের উচ্চ ঝুঁকি থাকার কারণে মানুষ নাগদেবীর পুজো করে আসছে, যাতে পরিবার ও পরিজনরা সুরক্ষিত থাকে। ধীরে ধীরে এই লোকবিশ্বাস বৃহত্তর ধর্মাচরণের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়।
দেবী মনসা এবং ভগবান শিবের মধ্যকার এই বিশেষ সম্পর্ক বুঝতে হলে ‘মানসকন্যা’ শব্দটির গভীর তাৎপর্য উপলব্ধি করা জরুরি। শাস্ত্রীয় বর্ণনা অনুযায়ী, সাধারণ পিতা-কন্যা সম্পর্কের চেয়ে এই উৎপত্তির প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ আলাদা। ফলে যখনই ভক্তরা মাতা মনসার পূজা করেন, তখন তাঁর সঙ্গে ভগবান শিবের এই অনন্য আধ্যাত্মিক সম্পর্কের কথাও স্মরণ করা হয়।
ভারতের উত্তরাখণ্ডের হরিদ্বারে অবস্থিত মা মনসা দেবীর বিখ্যাত মন্দিরটি বিশ্বজুড়ে ভক্তদের কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয়। শিবালিক পর্বতমালার মনোরম বিল্ব পর্বতের চূড়ায় অবস্থিত এই মন্দিরটি হরিদ্বারে আগত সমস্ত তীর্থযাত্রী ও পর্যটকদের জন্য একটি অন্যতম প্রধান ও পবিত্র তীর্থক্ষেত্র হিসেবে বিবেচিত হয়।