দলত্যাগ বিরোধী আইন কি কেবলই কথার কথা? ২০ জন টিএমসি সাংসদের ভাগ্য ঝুলে সুপ্রিম কোর্টে!

ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গনে দলত্যাগ বিরোধী আইন ও তার কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে। সংবিধানে সাংসদ বা বিধায়কদের দল পরিবর্তনের ক্ষেত্রে দশম তফসিল অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থার বিধান থাকলেও, বাস্তবে এর প্রয়োগ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে প্রশ্ন উঠছে। সম্প্রতি ২০ জন তৃণমূল কংগ্রেস (টিএমসি) সাংসদের দলত্যাগ সংক্রান্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ মামলা সুপ্রিম কোর্টে গড়িয়েছে। টিএমসি-র সাধারণ সম্পাদক এবং লোকসভা সাংসদ অভিষেক ব্যানার্জী এই সাংসদদের অযোগ্য ঘোষণার বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে লোকসভার স্পিকার ওম বিরলাকে নির্দেশ দেওয়ার আর্জি জানিয়ে গত ২৪ আগস্ট, ২০২৬ তারিখে একটি পিটিশন দাখিল করেন। প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্তের নেতৃত্বাধীন তিন বিচারপতির একটি বেঞ্চ ২৫ আগস্ট এই মামলার শুনানি শুরু করে।

মূল ঘটনা হলো, অভিযুক্ত এই ২০ জন সাংসদ টিএমসি ছেড়ে ন্যাশনালিস্ট সিটিজেনস পার্টি অফ ইন্ডিয়া (এনসিপিআই)-তে যোগ দিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। টিএমসি তাদের বিরুদ্ধে স্পিকারের কাছে পৃথক অযোগ্যতার আবেদন দাখিল করেছে। অভিষেক ব্যানার্জী ১৯ জুন বিষয়টি প্রথম উত্থাপন করেন, ২৭ জুলাই একটি স্মারকলিপি পাঠান এবং ১২ আগস্ট স্বয়ং স্পিকারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। দলের অভিযোগ, ওই সাংসদরা দলত্যাগ করে সম্পূর্ণ নতুন রাজনৈতিক পরিচয় গ্রহণ করেছেন। অন্যদিকে, অভিযুক্ত সাংসদদের দাবি, তাঁরা এনসিপিআই থেকে একটি পৃথক গোষ্ঠী হিসেবে কাজ করছেন। এখন এই পদক্ষেপটি আইনগতভাবে দলত্যাগ হিসেবে গণ্য হবে কি না, তা নির্ধারণের দায়িত্ব পুরোপুরি লোকসভার স্পিকারের ওপর ন্যস্ত।

শুধু এই ২০ জন টিএমসি সাংসদই নন, ২০২১ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত গত পাঁচ বছরে স্পিকারের কাছে এমন আরও বেশ কিছু মামলা ঝুলে রয়েছে যেগুলিতে আজ পর্যন্ত কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। এর মধ্যে সাতটি মামলা ছিল ২০২১ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে, এবং আগের লোকসভা ভেঙে যাওয়ার দিন অর্থাৎ ২০২৪ সাল পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। বর্তমানে ২০ জন টিএমসি সাংসদ এবং ১ জন জেডি(ইউ) সাংসদসহ মোট ২১টি অযোগ্যতার মামলা বিচারাধীন রয়েছে।

চলতি লোকসভায় অন্য দলের বিরুদ্ধেও অনুরূপ অভিযোগ রয়েছে। গত ১৯ মার্চ, জেডি(ইউ)-এর সাংসদ দিলেশ্বর কামৈত বাঁকার সাংসদ গিরিধারী যাদবের বিরুদ্ধে একটি পিটিশন দাখিল করেন। অভিযোগ ওঠে, বিহারের বেলহার বিধানসভা নির্বাচনে যাদব দলের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন এবং দলের প্রার্থীর পরিবর্তে তাঁর ছেলেকে (যিনি আরজেডি প্রার্থী ছিলেন) সমর্থন জুগিয়েছিলেন। এই মামলাটিও বর্তমানে লোকসভার স্পিকারের টেবিলে বিচারাধীন অবস্থায় রয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই দীর্ঘসূত্রিতা দলত্যাগ বিরোধী আইনের সবচেয়ে বড় আইনি ও বাস্তব দুর্বলতা। অতীতে ২০২১ সালে তৃণমূল কংগ্রেসের শিশির অধিকারী ও সুনীল কুমার মণ্ডল এবং ওয়াইএসআরসিপি-র কে. রঘুরাম কৃষ্ণ রাজুর বিরুদ্ধে দলত্যাগ বিরোধী আইনে অযোগ্যতার আবেদন করা হয়েছিল। লোকসভা সচিবালয় সেই বছরের জুলাই মাসে নোটিশ জারি করলেও, সেই মামলাগুলি প্রায় তিন বছর ধরে অমীমাংসিত থাকে এবং শেষ পর্যন্ত ২০২৪ সালে লোকসভা ভেঙে যাওয়ার কারণে কোনো ফয়সালা ছাড়াই বাতিল হয়ে যায়। এর ফলে বর্তমান মেয়াদ শেষ হওয়ার সাথে সাথে পূর্ববর্তী বহু পদক্ষেপ অকার্যকর হয়ে পড়ে। আইনে স্পষ্ট অযোগ্যতার কথা বলা থাকলেও স্পিকারের সিদ্ধান্তের জন্য কোনো নির্দিষ্ট সাংবিধানিক সময়সীমা না থাকায় এই জটিলতার সৃষ্টি হচ্ছে।

একই ধরনের জটিলতা দেখা গিয়েছিল ২০২৩ সালে এনসিপি-র অভ্যন্তরীণ বিভক্তির সময়ও। শরদ পাওয়ার গোষ্ঠী সুনীল টাটকরের সদস্যপদ বাতিলের দাবি জানালেও চার মাস ধরে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। পরবর্তীতে সুপ্রিয়া সুলে দ্রুত সিদ্ধান্তের আর্জি জানিয়ে স্পিকারকে চিঠি দেন। পারস্পরিক অযোগ্যতার আবেদন জমা পড়ার এই প্রবণতা রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে। এখন সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপে এই দীর্ঘস্থায়ী জট কাটবে কি না এবং স্পিকারের সিদ্ধান্তের ওপর কোনো সময়সীমা নির্ধারিত হবে কি না, সেদিকেই তাকিয়ে রয়েছে পুরো দেশ।