ফারাক্কার মারপ্যাঁচে কি ডুবছে বিহার? ২০২৬ সালের চুক্তির মেয়াদ ফুরোতেই ঘনাচ্ছে নতুন রাজনৈতিক সংকট!

১৯৯৬ সালের ঐতিহাসিক ভারত-বাংলাদেশ গঙ্গা জলবণ্টন চুক্তি, যা সাধারণ মানুষের কাছে ফারাক্কা জল চুক্তি নামেই বেশি পরিচিত, তা নিয়ে এখন বিহারের রাজনীতিতে তীব্র উত্তাপ ছড়াতে শুরু করেছে। দীর্ঘ ৩০ বছর মেয়াদী এই চুক্তিটির মেয়াদ আগামী ২০২৬ সালের ১২ই ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হতে চলেছে। তার আগেই চুক্তির নবায়ন প্রক্রিয়া এবং এর শর্তাবলী নিয়ে বিহারের রাজনৈতিক মহলে জোরালো প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। ক্ষমতাসীন দলের অন্যতম শরিক দল জেডিইউ (JDU)-এর পাশাপাশি প্রধান বিরোধী দল আরজেডি (RJD) এবং কংগ্রেসের মতো রাজনৈতিক দলগুলোও এই চুক্তিতে বিহারের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ ও নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
বিহারের মূল অভিযোগ, ফারাক্কা চুক্তি এবং এর ফলে নির্মিত বাঁধটি দীর্ঘদিন ধরে ওই অঞ্চলে তীব্র পানিসঙ্কট, ভয়াবহ বন্যা এবং অস্বাভাবিক পলি জমার মতো মারাত্মক সমস্যা তৈরি করে চলেছে। রাজ্যটির আপত্তির প্রধান কারণ হলো গ্রীষ্মকালীন মৌসুমে গঙ্গার জলের স্বল্প প্রবাহ, সুষম জলবণ্টন এবং বাঁধের প্রভাবে তলদেশে জমতে থাকা বিপুল পরিমাণ পলি। বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের সঙ্গে জলবণ্টন চুক্তি করার সময় বিহারের প্রকৃত স্বার্থের কথা বিবেচনা করা হয়নি, যার ফলে বর্তমানে রাজ্যের পানীয় জল সরবরাহ, সেচ ব্যবস্থা এবং কৃষিকাজ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
ফারাক্কা চুক্তির মূল পটভূমি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, পশ্চিমবঙ্গের গঙ্গা নদীর ওপর নির্মিত এই বাঁধের প্রাথমিক উদ্দেশ্য ছিল হুগলি নদীতে পর্যাপ্ত জলপ্রবাহ নিশ্চিত করা, যাতে কলকাতা বন্দরের পলি অপসারণ সহজ হয় এবং এর নৌপরিবহন ব্যবস্থা আরও সচল রাখা যায়। তবে গঙ্গার জল ব্যবহার ও বন্টন নিয়ে ভারত এবং বাংলাদেশের মধ্যে দীর্ঘ সময় ধরে দ্বিপক্ষীয় বিরোধ চলে আসছিল। অবশেষে বিভিন্ন অন্তর্বর্তীকালীন আলোচনার পর, উভয় দেশ ১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর ৩০ বছর মেয়াদী এই গঙ্গা জলবণ্টন চুক্তি স্বাক্ষর করে। চুক্তির নির্ধারিত সূত্র অনুযায়ী, ফারাক্কায় উপলব্ধ জলের নির্দিষ্ট অংশ ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ভাগ করে দেওয়ার সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা করা হয়েছিল।
তবে বর্তমানে চুক্তির মেয়াদ শেষের মুখে এসে দুই দেশের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের আলোচনা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। চুক্তি অনুযায়ী, ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ মে পর্যন্ত ১০ দিনের গড় জলপ্রবাহের ওপর ভিত্তি করে ফারাক্কায় জলের হিস্যা নির্ধারিত হয়। প্রবাহ ৭০,০০০ কিউসেক বা তার কম হলে উভয় দেশ সমান অর্থাৎ ৫০-৫০ অনুপাতে জল পায়। প্রবাহ ৭০,০০০ থেকে ৭৫,০০০ কিউসেকের মধ্যে থাকলে বাংলাদেশ পায় ৩৫,০০০ কিউসেক এবং বাকি অংশ পায় ভারত। অন্যদিকে, প্রবাহ ৭৫,০০০ কিউসেক বা তার বেশি হলে ভারত পায় ৪০,০০০ কিউসেক এবং অবশিষ্ট জল যায় বাংলাদেশের অংশে। পাশাপাশি, ১১ মার্চ থেকে ১০ মের মধ্যে পর্যায়ক্রমে তিনটি ১০ দিনের মেয়াদে উভয় দেশকে ৩৫,০০০ কিউসেক জল নিশ্চিত করার বিধান রয়েছে। কোনো ১০ দিনের সময়ে জলপ্রবাহ ৫০,০০০ কিউসেকের নিচে নেমে গেলে জরুরি ভিত্তিতে আলোচনা করে তা সমন্বয় করার শর্তও অনুচ্ছেদ ২-এ রাখা হয়েছে।
এই চুক্তির সঙ্গে বিহারের বন্যার গভীর যোগসূত্র রয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। সময়মতো ফারাক্কা ব্যারেজের গেটগুলি সদ্ব্যবহারে ব্যর্থ হওয়ায় উজানে গঙ্গার জল আটকে যাচ্ছে, যার ফলে বিহারের একাধিক জেলায় জলস্তর দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে ভয়াবহ বন্যার পরিস্থিতি তৈরি করছে। এছাড়া ব্যারেজ নির্মাণের পর থেকেই নদী ও তার বিভিন্ন উপনদীর তলদেশে প্রচুর পলি জমে নদীর জলবহন ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। জলবণ্টন নিয়ে বিহারের জেডিইউ-এর কার্যনির্বাহী সভাপতি ও রাজ্যসভা সাংসদ সঞ্জয় ঝা কেন্দ্রীয় সরকারকে বর্তমান চুক্তির শর্তে তা নবায়ন না করার অনুরোধ জানিয়েছেন। তাঁর যুক্তি, গ্রীষ্মকালে যখন বাংলাদেশের দিকে জল প্রবাহিত হয়, তখন বিহারেরও নিজেদের প্রয়োজনে গঙ্গার জল একান্ত প্রয়োজন।
কেন্দ্রীয় সরকারের সামনে এই পরিস্থিতি এক বিরাট কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। একদিকে যেমন এটি দুই দেশের সার্বভৌম সম্পর্কের একটি আন্তর্জাতিক বিষয়, অন্যদিকে তেমনই বিহারের জনস্বার্থ ও দাবি উপেক্ষা করা কেন্দ্রের পক্ষে কোনোভাবেই সহজ হবে না। সব মিলিয়ে ফারাক্কা চুক্তির ভবিষ্যৎ এখন কূটনীতি, যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো এবং বিহারের জল অধিকারের এক জটিল জালে আটকে রয়েছে। বিহার সরকার বা রাজনৈতিক দলগুলি চুক্তিটি সম্পূর্ণ বাতিল করতে চায় না, বরং তাদের সুনির্দিষ্ট দাবি হলো—কৃষি, সেচ, পানীয় জল, শিল্প ও পলি সমস্যার স্থায়ী সমাধান নিশ্চিত করে একটি নতুন ও সংশোধিত ব্যবস্থার মাধ্যমে চুক্তির নবায়ন করা হোক।