শিবলিঙ্গেই ষোলো শৃঙ্গার! বিশ্বের একমাত্র এই মন্দিরে নারী রূপে পূজিত হন স্বয়ং মহাদেব

মথুরা ও বৃন্দাবনের নাম উচ্চারণ করলেই ভক্তদের মনে ভেসে ওঠে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ও রাধারাণীর শাশ্বত প্রেমের পবিত্র স্মৃতি। ব্রজভূমির প্রতিটি ধূলিকণায় লুকিয়ে রয়েছে কৃষ্ণের লীলিবিলাসের অমর ইতিহাস। এই অঞ্চলে শ্রীকৃষ্ণের বহু ঐতিহাসিক ও বিশ্বখ্যাত মন্দির থাকলেও, দেবাদিদেব মহাদেবের উদ্দেশ্যে নিবেদিত একটি অত্যন্ত প্রাচীন ও রহস্যময় মন্দির রয়েছে, যা সমগ্র বিশ্বের সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কাছে পরম আশ্চর্যের বিষয়। বৃন্দাবনের অন্যতম প্রাচীন এই পবিত্র তীর্থক্ষেত্রটি ‘গোপেশ্বর মহাদেব মন্দির’ নামে সমাদৃত। হিন্দু পৌরাণিক বিশ্বাস অনুযায়ী, স্বয়ং ভগবান কৃষ্ণের পৌত্র বজ্রনাভ এই ঐতিহাসিক শিবলিঙ্গটি স্থাপন করেছিলেন। আর এই মন্দিরের সবচেয়ে বড় ও অবাক করা বৈশিষ্ট্য হলো, এটিই পৃথিবীর একমাত্র এমন শিবমন্দির যেখানে দেবাদিদেব মহাদেব পুরুষ রূপে নয়, বরং নারী বা গোপী রূপে পূজিত হন। দূরদূরান্ত থেকে ভক্তরা ছুটে আসেন মহাদেবের এই অলৌকিক ‘গোপী’ রূপ নিজ চোখে দর্শন করার জন্য।
এই মন্দিরের পুজো ও আচারের বিশেষত্বও অত্যন্ত আকর্ষণীয়। দিনের নির্দিষ্ট সময়ে শিবলিঙ্গের স্বাভাবিক পূজা সম্পন্ন হলেও, প্রতি দিন সন্ধ্যার পর এর রূপ সম্পূর্ণ বদলে যায়। সন্ধ্যার আরতির সময় এই শিবলিঙ্গকে ষোলোটি সুন্দর অলঙ্কার, রকমারি শাড়ি, গয়না, কপালে টিপ ও হাতের চুড়িতে এক অপরূপ গোপীর বেশে সাজিয়ে তোলা হয়। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, শ্রাবণ মাসের পবিত্র সময়ে এই মন্দিরে মহাদেবের চরণে ষোলোটি অলঙ্কার নিবেদন করলে ভক্তদের জীবনে চিরস্থায়ী সৌভাগ্য ও পরম শান্তি লাভ হয়। শ্রাবণ মাস শুরু হওয়ার পর থেকেই এই মন্দিরে ভক্তদের উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা যায়, যা এই স্থানের ধর্মীয় মাহাত্ম্যকে আরও বাড়িয়ে তোলে।
এই অদ্ভুত প্রথার নেপথ্যে রয়েছে দ্বাপর যুগের এক রোমাঞ্চকর পৌরাণিক কাহিনী। প্রবাদ রয়েছে যে, ভগবান শ্রীকৃষ্ণ যখন বৃন্দাবনে গোপিনীদের সঙ্গে ঐতিহাসিক মহারাসলীলায় মগ্ন ছিলেন, তখন সেই স্বর্গীয় দৃশ্য দেখার তীব্র ইচ্ছা জাগে দেবাদিদেব মহাদেবের মনে। কৈলাস পর্বত ছেড়ে তিনি সোজা বৃন্দাবনে উপস্থিত হন। কিন্তু নিয়ম ছিল যে, মহারাসে কেবল গোপিনীদেরই প্রবেশের ও অংশগ্রহণের অনুমতি রয়েছে। এই পরিস্থিতি সামাল দিতে মহাদেব এক অভিনব কৌশল অবলম্বন করেন। তিনি নিজের দিব্য শক্তি দিয়ে এক অপরূপ গোপীর রূপ ধারণ করেন এবং সেই ছদ্মবেশেই মহারাসে যোগ দিয়ে কৃষ্ণের সঙ্গে নৃত্য করেন। কিন্তু অন্তর্যামী শ্রীকৃষ্ণ বুঝতে পারেন যে এই গোপিনী সাধারণ কেউ নন, স্বয়ং মহাদেব। তখন কৃষ্ণ অত্যন্ত আনন্দিত হয়ে শিবের নতুন নামকরণ করেন ‘গোপেশ্বর’, যার অর্থ দাঁড়ায় ‘গোপীদের অধিপতি’। কেবল তাই নয়, কৃষ্ণ মহাদেবকে চিরকালের মতো ব্রজভূমিতে বাস করার অনুরোধ জানান। সেই থেকেই দেবাদিদেব মহাদেব গোপেশ্বর রূপে বৃন্দাবনে স্থায়ীভাবে অবস্থান করছেন এবং ভক্তদের সমস্ত মনবাঞ্ছা পূরণ করে চলেছেন।