বিচারবিভাগে নগ্ন হস্তক্ষেপ! নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন শাহের বিরুদ্ধে গর্জে উঠল মানবাধিকার সংস্থাগুলো

নেপালের বর্তমান রাজনৈতিক ময়দানে চরম অস্থিরতা ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। র‍্যাপার থেকে রাজনীতিবিদ এবং পরবর্তীতে দেশের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হয়ে প্রধানমন্ত্রী পদে আসীন হওয়ার পর থেকেই বালেন শাহ নিজের খেয়ালখুশিমতো দেশ পরিচালনা করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। রাষ্ট্রপতির সঙ্গে কোনো ধরনের পরামর্শ না করা, সাংবিধানিক ঐতিহ্যকে বুড়ো আঙুল দেখানো এবং দেশের সর্বোচ্চ আদালতের ওপর সরাসরি হস্তক্ষেপের মতো গুরুতর অভিযোগে কাঠগড়ায় দাঁড়িয়েছেন তিনি। বিশেষ করে, বালেন শাহের সরকারের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টের তিনজন বিচারপতিকে অন্যায়ভাবে পদত্যাগে বাধ্য করার গুরুতর অভিযোগ এনেছে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ও হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মতো আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলি। যা নিয়ে নেপালের রাজনৈতিক ও বিচারবিভাগীয় মহলে তীব্র অসন্তোষ ও ক্ষোভের আগুন জ্বলছে।

নেপালের দীর্ঘদিনের সংসদীয় গণতন্ত্রে প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির মধ্যে নিয়মিত সাংবিধানিক সংলাপ ও সুসম্পর্ক বজায় রাখার ঐতিহ্য রয়েছে। কিন্তু বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বালেন শাহ এই প্রথার প্রতি চরম অবজ্ঞা প্রদর্শন করছেন। দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র চার মাসের মধ্যেই তিনি রাষ্ট্রপতি রামচন্দ্র পাউডেলের সরকারি বাসভবন ‘শীতল নিবাস’-এর সঙ্গে কার্যত সমস্ত যোগসূত্র বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছেন। বর্তমানে দুই শীর্ষ নেতার সাক্ষাৎ কেবল কিছু বাধ্যতামূলক দাপ্তরিক অনুষ্ঠানেই সীমিত রয়েছে। রাষ্ট্রপতির সঙ্গে কোনো সরাসরি বা ব্যক্তিগত বৈঠক না করে, মন্ত্রিসভার গুরুত্বপূর্ণ সব সিদ্ধান্ত সরাসরি রাষ্ট্রপতির দপ্তরে পৌঁছে দেওয়ার জন্য তিনি মুখ্য সচিব পর্যায়ের কর্মকর্তাদের ব্যবহার করছেন। শীতল নিবাসের দায়িত্বপ্রাপ্ত শীর্ষ কর্মকর্তারা প্রধানমন্ত্রীর এই একতরফা আচরণকে দেশের গণতান্ত্রিক ঐতিহ্যের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন বলে অভিহিত করেছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তার মতে, শপথ গ্রহণের পর থেকে জাতীয় নীতি বা শাসনব্যবস্থা নিয়ে একবারও রাষ্ট্রপতির সঙ্গে আলোচনা করতে যাননি প্রধানমন্ত্রী।

যদিও প্রধানমন্ত্রীর সচিবালয় এই ক্রমবর্ধমান দূরত্ব বা মতপার্থক্যের সমস্ত খবর জোরালোভাবে নাকচ করে দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা অসীম শাহ স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে এই অভিযোগের কোনো ভিত্তি নেই। তবে শুধু রাষ্ট্রপতি ভবনই নয়, বালেন শাহ নেপালের কয়েক দশক পুরোনো পররাষ্ট্রনীতি এবং চিরাচরিত কূটনৈতিক প্রোটোকলও আমূল বদলে দিয়েছেন। ঐতিহ্য অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর বিদেশি রাষ্ট্রদূতদের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে বৈঠক করার রীতি থাকলেও, বালেন সেই প্রথা ভেঙে সমস্ত দেশের রাষ্ট্রদূতদের সঙ্গে একযোগে সর্বদলীয় বৈঠক করার নতুন নীতি চালু করেছেন। সম্প্রতি সেরকমই এক সর্বদলীয় বৈঠকে নেপালি কংগ্রেস প্রধান গগন কুমার থাপা গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা থেকে প্রধানমন্ত্রীর অনুপস্থিতি নিয়ে তীব্র প্রতিবাদ জানান।

পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করেছে যখন স্বাধীন বিচার বিভাগের ওপর সরকারি হস্তক্ষেপের অভিযোগ প্রকাশ্যে এসেছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলির স্পষ্ট অভিযোগ, বালেন সরকার বিচার ব্যবস্থার ওপর তীব্র রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করছে এবং আদালতের বিচারপতিদের পদত্যাগ করতে বাধ্য করছে। সরকারের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টের তিনজন বিশিষ্ট বিচারপতি—স্বপ্না প্রধান মল্ল, কুমার রেগমি এবং হরি ফুয়ালকে জোরপূর্বক পদত্যাগে চাপ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। পাশাপাশি, নেপালের সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি নিয়োগের দীর্ঘ ৭০ বছরের ঐতিহ্যও ভেঙে দেওয়া হয়েছে। অতীতে জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে পরবর্তী প্রধান বিচারপতি নিয়োগের রীতি থাকলেও, বর্তমান প্রধান বিচারপতি প্রকাশ মানসিং রাউতের অবসরের পর সেই প্রথা মানা হয়নি। জ্যেষ্ঠতার তালিকায় এগিয়ে থাকা স্বপ্না প্রধান মল্ল ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করলেও সাংবিধানিক পরিষদ তাঁকে প্রধান বিচারপতি হিসেবে সুপারিশ করেনি। এই ঘটনায় তীব্র বিতর্ক তৈরি হলে প্রধানমন্ত্রী সাফ জানিয়ে দেন যে শুধুমাত্র ঐতিহ্যের ভিত্তিতে নয়, মেধার ভিত্তিতেই পদায়ন হওয়া উচিত। মানবাধিকার সংস্থাগুলি এই সাংবিধানিক পরিবর্তনেরও তীব্র বিরোধিতা করেছে।

উল্লেখ্য, অতীতে দুর্নীতি দমন এবং প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলিকে গ্রেফতার করার মতো সাহসী ও কঠোর পদক্ষেপ নিয়ে দেশের তরুণ প্রজন্মের কাছে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন বালেন শাহ। সরকারি দপ্তর থেকে রাজনীতিবিদদের ছবি সরিয়ে ভিআইপি সংস্কৃতি বিলুপ্ত করা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ করা এবং গণমাধ্যমের পরিবর্তে সরাসরি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে তিনি নেপালের রাজনৈতিক সমীকরণ বদলে দিয়েছিলেন। কিন্তু বর্তমান একরোখা শাসনপদ্ধতি তাঁকে দেশের বিরোধী দল, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান এবং বিচার বিভাগের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।