লিফট প্রস্তুতকারক কোম্পানিগুলোর ঘুম কেড়ে নিল শীর্ষ আদালতের এই নির্দেশ! জানুন বিস্তারিত

শপিং মল, হাসপাতাল, অফিস কিংবা বহুতল আবাসিক এলাকা—আজকের দিনে আমাদের দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে লিফট একটি অত্যন্ত অপরিহার্য অংশ হয়ে উঠেছে। প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ মানুষ কোনো ধরনের আগাম সংশয় ছাড়াই এই যান্ত্রিক ব্যবস্থার ওপর ভরসা করে যাতায়াত করেন। কিন্তু কখনো কি ভেবে দেখেছেন, কোনো বহুতলে লিফট হঠাৎ মাঝপথে আটকে গেলে, হড়কে নিচে নেমে গেলে কিংবা কোনো মারাত্মক যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দিলে তার পরিণতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে? যদি এমন কোনো মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় কোনো নিরপরাধ মানুষের গুরুতর আঘাত বা প্রাণহানির মতো ঘটনা ঘটে, তবে সেই অপরাধের দায়ভার শেষ পর্যন্ত কার ওপর বর্তাবে? সাধারণ মানুষের মনে দীর্ঘদিন ধরে ঘুরপাক খাওয়া এই অত্যন্ত সংবেদনশীল ও আইনি প্রশ্নের এক যুগান্তকারী ও স্পষ্ট জবাব দিয়েছে ভারতের সর্বোচ্চ আদালত, যা দেশের প্রতিটি সাধারণ নাগরিকের আইনি অধিকার এবং সুরক্ষাকে বহু গুণে শক্তিশালী করে তুলল।

সুপ্রিম কোর্ট অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছে যে, লিফট প্রস্তুতকারী এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা কোম্পানিগুলো তাদের প্রাথমিক নৈতিক ও আইনগত দায় এড়াতে পারবে না। আদালতের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, লিফট এমন একটি সংবেদনশীল ও জটিল প্রযুক্তিগত যন্ত্র, যা প্রতিদিন হাজার হাজার সাধারণ মানুষের সরাসরি জীবন ও নিরাপত্তার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকে। তাই এই সমস্ত সংস্থাগুলোর ওপর চরম সতর্কতা ও নিখুঁত নিরাপত্তা বজায় রাখার সুনির্দিষ্ট আইনগত বাধ্যবাধকতা রয়েছে। যদি কোনো কোম্পানি সময়মতো লিফটের নিয়মিত পরিদর্শন করতে, ত্রুটিপূর্ণ অংশ মেরামত করতে কিংবা কঠোর নিরাপত্তা বিধিগুলো নিখুঁতভাবে মেনে চলতে ব্যর্থ হয় এবং তার ফলে কোনো প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা ঘটে, তবে সেই সংস্থাকেই সম্পূর্ণভাবে দায়ী করা হবে এবং তারা কোনোভাবেই আইনি ছাড় পেতে পারে না।

আদালতের এই ঐতিহাসিক রায়টি মূলত ২০০৩ সালের একটি মর্মান্তিক লিফট দুর্ঘটনার পটভূমিতে এসেছে, যে দুর্ঘটনায় ‘র’ (RAW)-এর বিশিষ্ট কর্মকর্তা বিপিন হান্ডা অত্যন্ত করুণভাবে প্রাণ হারিয়েছিলেন। দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট রায় দেয় যে, বিখ্যাত লিফট প্রস্তুতকারক সংস্থা ওটিস এলিভেটর (ইন্ডিয়া) লিমিটেড তাদের দায়িত্বহীনতা ও অবহেলার দায় এড়াতে পারে না। আদালতে প্রমাণিত হয়েছিল যে, কোম্পানিটি লিফটের অভ্যন্তরীণ সমস্যা সম্পর্কে আগে থেকেই ওয়াকিবহাল ছিল, অথচ মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলে তারা নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য কোনো ধরনের সময়োপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। ২০০৩ সালের ২০ মার্চ নয়াদিল্লির সিজিও কমপ্লেক্সে অবস্থিত ‘র’ অফিসে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক শেষে ১৩ জন কর্মকর্তা যখন ৬ নম্বর লিফটে করে নিচে নামছিলেন, তখন মাঝপথেই লিফটটি বিকল হয়ে যায়। উদ্ধারের সময় লিফটটি হঠাৎ নিচে পিছলে পড়লে মাথায় গুরুতর আঘাত পেয়ে ঘটনাস্থলেই মারা যান বিপিন হান্ডা।

কারিগরি তদন্তে চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে আসে যে, অতীতেও লিফটি বহুবার কোনো কারণ ছাড়াই হঠাৎ থেমে গিয়েছিল। ভোল্টেজের ওঠানামার সমস্যা থাকলেও তা অবহেলা করা হয়েছিল এবং চালকরাও জরুরি উদ্ধারকার্যে প্রশিক্ষিত ছিলেন না। জাতীয় ভোক্তা বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন (এনসিডিআরসি) এই ঘটনায় ওটিসকে ৭০ শতাংশ, এমইএসকে ২৫ শতাংশ এবং র-কে ৫ শতাংশ দায়ী করে ৩.০১ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণের নির্দেশ দেয়। সুপ্রিম কোর্ট এই রায় বহাল রেখে পরিষ্কার করে দিয়েছে যে, জননিরাপত্তার প্রশ্নে কোনো সংস্থাই শৈথিল্য দেখাতে পারবে না। এই রায়ের ফলে মল, হাসপাতাল, হোটেল ও হাউজিং সোসাইটির মতো জনবহুল স্থানগুলোতে লিফটের নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব বহুগুণ বেড়ে গেল।