শাঁখা-পলা, সিঁদুর আর সাতপাক! ঢাকার ঐতিহাসিক মন্দিরে কোন রূপান্তরকামী তারকার বিয়ে নিয়ে তোলপাড় নেটপাড়া?

আধুনিকতার জোয়ার এবং মুক্তচিন্তার নতুন হাওয়া এখন ওপার বাংলাতেও স্পষ্টভাবে অনুভূত হচ্ছে। আর সেই পরিবর্তনের ধারাকেই জোরালোভাবে সামনে রেখে বাংলাদেশর ইতিহাসে এক অভাবনীয় এবং যুগান্তকারী ঘটনার সাক্ষী থাকল দেশবাসী। ওপার বাংলার মাটিতে এই প্রথম অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণভাবে এবং প্রকাশ্যে সম্পন্ন হলো একটি সমকামী বিবাহ। আর এই ঐতিহাসিক বিবাহানুষ্ঠানের সাক্ষী রইল ঢাকার প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী ঢাকেশ্বরী মন্দির। সনাতন হিন্দু ধর্মীয় সমস্ত রীতিনীতি মেনে, দেবীকে সাক্ষী রেখেই বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছেন এই দুই প্রেমিক যুগল।
বিয়ে করা এই জুটির অন্যতম একজন হলেন তাসনুভা আনান শিশির। জন্মসূত্রে পুরুষ হিসেবে জন্মগ্রহণ করলেও পরবর্তীকালে নিজের প্রকৃত সত্তাকে উপলব্ধি করে তিনি অস্ত্রোপচার ও অন্যান্য প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নারী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। ঐতিহ্যের প্রতীক ঢাকা শহরের এই ঐতিহাসিক মন্দিরে নিজের প্রেমিকের সঙ্গে হিন্দু মতে সাতপাক ঘুরে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছেন তিনি। বিয়ের এই বিশেষ মুহূর্তের একাধিক ছবি ইতিমধ্যেই সোশ্যাল মিডিয়ায় দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছে এবং মুহূর্তেই তা ভাইরাল হয়ে গেছে। প্রকাশ্যে আসা ছবিগুলিতে দেখা যাচ্ছে, নববধূর সাজে সেজে ওঠা শিশির ঐতিহ্যবাহী শাঁখা ও পলা পরিধান করেছেন। এমনকি তাঁর সিঁথিতে জ্বলজ্বল করছে সিঁদুরের রাঙা রেখাও। একেবারে খাঁটি বাঙালি নতুন বধূর লুকে তাঁর এই রূপান্তর এবং সাহসী উপস্থিতি নেটিজেনদের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
উল্লেখ্য, এর আগেও কর্মজীবনে সাফল্যের সুবাদে খবরের শিরোনামে এসেছিলেন তাসনুভা আনান শিশির। ২০২১ সালের আন্তর্জাতিক নারী দিবসের দিন বাংলাদেশের জনপ্রিয় টেলিভিশন চ্যানেল বৈশাখী টিভিতে সংবাদ পাঠ করে তিনি দেশের প্রথম রূপান্তরিত নারী সংবাদপাঠক হিসেবে এক ঐতিহাসিক ইতিহাস গড়েছিলেন। নিজের পেশাগত জীবনে এবং সমাজ গঠনে এগিয়ে চলার পথে তাঁকে নানা সামাজিক চ্যালেঞ্জ ও কাঠিন্যের মুখোমুখি হতে হয়েছিল। পরবর্তীতে তিনি উচ্চশিক্ষা ও কাজের সুবাদে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান। তবে সুদূর আমেরিকা থেকে ফিরে এসে নিজের জন্মভূমিতে দাঁড়িয়ে দেশের প্রাচীন সনাতন রীতি মেনে সম্পন্ন হওয়া এই ব্যতিক্রমী বিয়ে ভূ-রাজনৈতিক গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমেরও নজর কেড়েছে।
বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে এর আগেও বহু সমকামী ও রূপান্তরকামী বিয়ের নজির ও আইনি স্বীকৃতি মিললেও, বাংলাদেশের কোনো নাগরিকের ক্ষেত্রে এই প্রথম এমন দৃষ্টান্ত স্থাপন করা হলো। সমাজের প্রচলিত রক্ষণশীল ধারণাকে ভেঙে যেভাবে তিনি নিজের আসল সত্তাকে প্রকাশ্যে এনেছেন এবং নিজের পছন্দের জীবনসঙ্গীকে আপন করে নিয়েছেন, তা নিয়ে এখন দুই বাংলার ভার্চুয়াল দুনিয়ায় বইছে ঝড়ের বেগ। সোশ্যাল মিডিয়ায় এই ঐতিহাসিক পদক্ষেপকে ঘিরে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে এবং নেটিজেনদের পক্ষ থেকে অত্যন্ত মিশ্র প্রতিক্রিয়া আস আসছে। একদল যেমন তাঁর এই সাহসিকতা ও অধিকারের লড়াইকে কুর্নিশ জানিয়ে সাধুবাদ জানাচ্ছেন, তেমনই অন্য একটি রক্ষণশীল অংশ এর কঠোর সমালোচনায় মুখর হয়েছেন। সবমিলিয়ে, এই বিয়ে এই মুহূর্তে উপারের সমাজের সবচেয়ে আলোচিত এবং চাঞ্চল্যকর ঘটনায় পরিণত হয়েছে।