লোকসভায় বড় ধাক্কা খেল তৃণমূল, মমতার শাসন চ্যালেঞ্জ করে কি দলবদলের পথে বিদ্রোহীরা?

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক সাম্রাজ্যে বড়সড় ধসের পূর্বাভাস। বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফলের পর তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরে জমে থাকা ক্ষোভ যে আগ্নেয়গিরির মতো ফেটে পড়বে, তা কার্যত স্পষ্ট হয়ে গেল। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, তৃণমূলের লোকসভার ২৮ জন সাংসদের মধ্যে ২০ জনই এনডিএ-কে সমর্থনের কথা জানিয়ে লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লাকে আনুষ্ঠানিক চিঠি দিয়েছেন। লোকসভার চিফ হুইপ কাকলি ঘোষ দস্তিদার এই তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি তৃণমূলের জন্য এক ভয়াবহ বিপর্যয়। বিদ্রোহী এই সাংসদরা এখনই সরাসরি বিজেপিতে যোগ না দিলেও, লোকসভায় পৃথক সংসদীয় গোষ্ঠী হিসেবে কাজ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। কৌশলী এই পদক্ষেপের মাধ্যমে তাঁরা দলত্যাগ বিরোধী আইনের আইনি জটিলতা এড়িয়ে এনডিএ-র শক্তি বহুগুণ বাড়িয়ে দিলেন। লোকসভায় তৃণমূলের চিফ হুইপ হিসেবে কাকলি ঘোষ দস্তিদারকে বহাল রাখার দাবি জানিয়েছেন বিদ্রোহীরা, যা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শীর্ষ নেতৃত্বের প্রতি সরাসরি চ্যালেঞ্জ। জানা গেছে, দলনেত্রী তাঁকে সরিয়ে কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে দায়িত্ব দিতে চাইলেও সেই বার্তা লোকসভা সচিবালয়ে পৌঁছানোর আগেই বিদ্রোহীরা নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে তুলে নিয়েছেন। লোকসভার এই সংখ্যাতত্ত্বে তৃণমূল এখন সংখ্যালঘু হওয়ার পথে।

পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে উচ্চকক্ষে। তৃণমূলের প্রবীণ সাংসদ সুখেন্দু শেখর রায় দল ও রাজ্যসভার সদস্যপদ থেকে ইস্তফা দিয়েছেন। সাম্প্রতিক আরজি কর হাসপাতাল কাণ্ড এবং দলের অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি নিয়ে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ উগড়ে দিয়ে তিনি জানিয়েছেন, দলে তিনি ক্রমশ একা হয়ে পড়ছিলেন। রাজনীতির ময়দান থেকে আপাতত সরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত দিলেও, তাঁর এই প্রস্থান তৃণমূলের রাজ্যসভার শক্তি ১৩ থেকে কমিয়ে ১২-তে নামিয়ে এনেছে।

শুধু সংসদ নয়, বিধানসভাতেও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পায়ের তলা থেকে মাটি সরছে। তৃণমূলের ৮০ জন বিধায়কের মধ্যে ৫৮ জন বিদ্রোহী বিধায়ক হাত মিলিয়ে নতুন গোষ্ঠী তৈরি করেছেন। তাঁরা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে বিধানসভার বিরোধী দলনেতা হিসেবে নির্বাচিত করেছেন এবং স্পিকার রথীন্দ্র বসু সেই গোষ্ঠীকে স্বীকৃতিও দিয়েছেন। যদিও তাঁরা এখনই বিজেপিতে যোগ দেওয়ার বিষয়টি এড়িয়ে গেছেন, তবে ‘গঠনমূলক বিরোধী’ হিসেবে কাজ করার ঘোষণা দিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রশাসনিক ক্ষমতাকে কার্যত নড়বড়ে করে দিয়েছেন। রাজ্যের প্রশাসনিক বৈঠকে উপস্থিত থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে শুধুমাত্র ‘প্রধান উপদেষ্টা’ হিসেবে থাকার প্রস্তাব দিয়ে বিদ্রোহীরা একপ্রকার বুঝিয়ে দিয়েছেন, দলের রাশ এখন আর তাঁর হাতে নেই। রবিবারের জরুরি বৈঠকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কী সিদ্ধান্ত নেন এবং এই বিদ্রোহ সামলাতে তিনি শেষ পর্যন্ত কী রণকৌশল অবলম্বন করেন, তা-ই এখন বাংলার রাজনীতির প্রধান আলোচনার বিষয়।

Related Posts

© 2026 Tips24 - WordPress Theme by WPEnjoy