উত্তরপ্রদেশের গ্রামীণ অর্থনীতি ও কৃষি ব্যবস্থার খোলনলচে বদলে দিতে শুরু থেকেই বড়সড় পদক্ষেপ গ্রহণ করে চলেছে মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথের নেতৃত্বাধীন সরকার। ২০১৭ সালে রাজ্যে ক্ষমতায় আসার পরপরই প্রথম ক্যাবিনেট সিদ্ধান্তেই রাজ্যের কৃষকদের ৩৬ হাজার কোটি টাকারও বেশি ঋণ মকুব করে এক নজিরবিহীন নজির গড়েছিল এই সরকার। তবে শুধু ঋণ মকুবই নয়, উত্তরপ্রদেশের অন্যতম প্রধান অর্থকরী ফসল আখের চাষ এবং চাষিদের সুরক্ষায় বিগত ৯ বছর ধরে লাগাতার কাজ করে চলেছে যোগী প্রশাসন। কৃষকরা যাতে তাদের উৎপাদিত ফসলের সঠিক মূল্য এবং তা যেন অত্যন্ত দ্রুত ও সময়মতো পেয়ে যান, তা নিশ্চিত করাই ছিল সরকারের মূল লক্ষ্য।
যোগী সরকারের স্বচ্ছ, দুর্নীতিমুক্ত এবং সম্পূর্ণ আধুনিক প্রযুক্তি-ভিত্তিক ব্যবস্থার ফলে ২০১৭ সাল থেকে আজ পর্যন্ত উত্তরপ্রদেশের আখ চাষিদের মোট ৩,২১,৯৬৩ কোটি টাকা সরাসরি মিটিয়ে দেওয়া হয়েছে, যা ভারতের কৃষি ইতিহাসে একটি অলৌকিক রেকর্ড। এই বিপুল পরিমাণ অর্থ কোনো মধ্যস্থতাকারী ছাড়াই সরাসরি ‘ডাইরেক্ট বেনিফিট ট্রান্সফার’ বা ডিবিটি (DBT) ব্যবস্থার মাধ্যমে কৃষকদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে পাঠানো হয়েছে। এর ফলে পূর্বতন সরকারগুলির আমল থেকে চলে আসা চিরস্থায়ী দালাল ও ফড়েদের দৌরাত্ম্য এবং দুর্নীতি পুরোপুরি শেষ হয়ে গেছে। বর্তমান উত্তরপ্রদেশে আখ ও চিনি শিল্প গ্রামীণ অর্থনীতির এক মজবুত ও অবিচ্ছেদ্য স্তম্ভ হয়ে উঠেছে। কৃষকদের বার্ষিক আয় দ্বিগুণ করা, গ্রামীণ যুবকদের কর্মসংস্থান এবং সামগ্রিক গ্রামীণ পরিকাঠামোকে শক্তিশালী করতে সরকার এই ধারাবাহিক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
যদি বিগত সরকারগুলির পরিসংখ্যানের দিকে নজর দেওয়া যায়, তবে স্পষ্ট বোঝা যাবে যে যোগী সরকারের নীতি আগের চেয়ে বহুগুণ বেশি কার্যকর ও কৃষক-বান্ধব প্রমাণিত হয়েছে। তথ্য অনুযায়ী, ২০০৭ থেকে ২০১২ সালের মায়াবতী সরকারের আমলে আখ চাষিদের দেওয়া হয়েছিল মাত্র ৫২,১৩১ কোটি টাকা। এরপর ২০১২ থেকে ২০১৭ সালের অখিলেশ যাদবের সমাজবাদী পার্টি সরকারের আমলে এই পেমেন্টের অঙ্কটা ছিল ৯৫,২১িস কোটি টাকা। কিন্তু যোগী সরকার তার ৯ বছরের শাসনকালেই অতীতের সব রেকর্ড চূর্ণ করে কৃষকদের ৩ লক্ষ কোটি টাকারও বেশি পেমেন্ট নিশ্চিত করেছে। সরকারের ফ্ল্যাগশিপ স্কিম ‘স্মার্ট আখ কিসান’ যোজনার মাধ্যমে আখের চাষের এলাকা নির্ধারণ, সাট্টা, ক্যালেন্ডারিং এবং পার্চি বা রসিদ দেওয়ার সম্পূর্ণ ম্যানুয়াল প্রক্রিয়াটিকে ডিজিটাল বা অনলাইন করে দেওয়া হয়েছে। এখন চাষিদের আর রসিদের জন্য দপ্তরে দপ্তরে ঘুরতে হয় না, সরাসরি তাদের মোবাইল ফোনে ডিজিটাল রসিদ চলে আসে।
কৃষকদের আরও বড় স্বস্তি দিয়ে ২০২৫-২৬ মরসুমের জন্য আখের দাম প্রতি কুইন্টাল এক ধাক্কায় ৩০ টাকা বাড়িয়ে দিয়েছে উত্তরপ্রদেশ সরকার। নতুন এই সংশোধিত দর অনুযায়ী, আগাম বা আগাম জাতের আখের দাম প্রতি কুইন্টাল ৪০০ টাকা এবং সাধারণ জাতের আখের দাম ৩৯০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। সরকারের এই একটিমাত্র সময়োপযোগী সিদ্ধান্তের ফলে রাজ্যের কৃষকরা প্রায় ৩০০০ কোটি টাকা অতিরিক্ত লাভ করতে পারবেন। উল্লেখ্য, যোগী সরকারের আমলে এই নিয়ে মোট চারবার আখের ন্যূনতম সহায়ক মূল্য বৃদ্ধি করা হলো। সময়মতো ১০০ শতাংশ পেমেন্ট এবং লাগাতার দাম বাড়ার সরাসরি সুবিধা পাচ্ছে রাজ্যের প্রায় ৪৮ লক্ষ আখ চাষি পরিবার। রাজ্য সরকারের দৃঢ় বিশ্বাস, উত্তরপ্রদেশের অর্থনীতিকে ১ ট্রিলিয়ন ডলারে (১ লাখ কোটি ডলার) নিয়ে যাওয়ার যে লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে, তা পূরণে রাজ্যের আখ উন্নয়ন দপ্তর সবচেয়ে বড় ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
আজকের দিনে দাঁড়িয়ে উত্তরপ্রদেশ শুধু ভারতের রাজনৈতিক মানচিত্রেই নয়, বরং দেশের বৃহত্তম আখ উৎপাদক রাজ্য হিসেবেও নিজের স্থান পাকা করে নিয়েছে। রাজ্যে আখ চাষের এলাকা দিন দিন ব্যপকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমানে রাজ্যে ২৯.৫১ লক্ষ হেক্টর জমিতে আখের চাষ হচ্ছে। এই মুহূর্তে উত্তরপ্রদেশে মোট ১২১টি চিনিকল পুরোদমে চালু রয়েছে। এর মধ্যে উত্তরপ্রদেশ রাজ্য চিনি নিগমের অধীনে রয়েছে ৩টি, সমবায় চিনি কল সংঘের অধীনে ২৩টি এবং বেসরকারি উদ্যোগে পরিচালিত হচ্ছে ৯৫টি চিনিকল। এই কলগুলি সম্মিলিতভাবে ৮৭৭.৯৩ লক্ষ টন আখ মাড়াই করে রেকর্ড ৮৯.৬৮ লক্ষ টন চিনি উৎপাদন করতে সক্ষম হয়েছে। গত মাড়াই মরসুমে উত্তরপ্রদেশের গড় চিনি পুনরুদ্ধারের হার বা সুগার রিকভারি রেট ছিল ১০.২১ শতাংশ, যা দেশের অন্যতম প্রধান চিনি উৎপাদক রাজ্য মহারাষ্ট্রের (৯.৪৯ শতাংশ) তুলনায় অনেকটাই বেশি।
রাজ্যে দীর্ঘকাল ধরে বন্ধ হয়ে পড়ে থাকা চিনিকলগুলি পুনরায় চালু করা, নতুন আধুনিক প্রযুক্তিসম্পন্ন কল স্থাপন এবং পুরোনো কলগুলির উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ানোর কাজ যুদ্ধকালীন তৎপরতায় শেষ করেছে যোগী প্রশাসন। চিনিকলগুলির দৈনিক মাড়াই ক্ষমতা ১,২৮,৫০০ টিসিডি (টনস কেন ক্রাশড পার ডে) বাড়ানো হয়েছে। এই আধুনিকীকরণ এবং নতুন শিল্প বিকাশের কারণে রাজ্যে ১০ লক্ষেরও বেশি মানুষের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর্মসংস্থানের এক বিশাল সুযোগ তৈরি হয়েছে। গত ৯ বছরে এই ক্ষেত্রে প্রায় ৬৯২৪ কোটি টাকার অতিরিক্ত কর্পোরেট বিনিয়োগ এসেছে। এর পাশাপাশি পরিবেশ-বান্ধব ইথানল উৎপাদনের ক্ষেত্রেও উত্তরপ্রদেশ দেশের মধ্যে এক নম্বর স্থান দখল করেছে। সরকারের বহুমুখী প্রচেষ্টায় রাজ্যে ইথানল উৎপাদন এক লাফে বেড়ে বর্তমানে ১৮৮ কোটি লিটারে পৌঁছেছে, যা গ্রামীণ অর্থনীতিতে এক নতুন জোয়ার এনেছে।
রাজ্যের আখ কমিশনার মিনস্টি এস. এই বিষয়ে জানিয়েছেন যে, কৃষকদের মাঠপর্যায়ের সমস্ত সমস্যার দ্রুত ও স্থায়ী সমাধানের জন্য আধুনিক প্রযুক্তি এবং সম্পূর্ণ ডিজিটাল পরিকাঠামোকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সরকারের তৈরি ‘ই-আখ অ্যাপ’, অনলাইন লাইভ সার্ভে, স্বচ্ছ পার্চি বিতরণ এবং দ্রুত অভিযোগ নিষ্পত্তির মতো আধুনিক ডিজিটাল সুবিধা পেয়ে কৃষকরা এক বুক স্বস্তি পেয়েছেন। এখন লক্ষ লক্ষ কৃষক কোনো অফিসে না গিয়ে ঘরে বসেই শুধুমাত্র মোবাইলের মাধ্যমে আখ সংক্রান্ত সমস্ত লাইভ আপডেট পাচ্ছেন। এছাড়া কৃষকদের যেকোনো সমস্যার ২৪ ঘণ্টা তাৎক্ষণিক সমাধানের জন্য একটি ডেডিকেটেড টোল-ফ্রি কল সেন্টার নম্বর ১৮০০-১২১-৩২০৩ চালু করা হয়েছে, যা দিনরাত সক্রিয় থাকে।





