নদিয়ার করিমপুর, থানারপাড়া থেকে মুরুটিয়া—বর্তমানে এই বিস্তীর্ণ এলাকার মাঠের দিকে তাকালে মনে হবে যেন প্রকৃতি সাদা চাদর বিছিয়ে দিয়েছে। চারিদিকে শুধুই রসুন আর রসুন। কোথাও বাড়ির ছাদে, কোথাও উঠোনে, আবার কোথাও বিঘার পর বিঘা লিজ নেওয়া জমিতে সারি সারি রসুন শুকনোর ব্যস্ততা তুঙ্গে। এই দৃশ্যই এখন নদিয়ার কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা টানা ২০ দিন ধরে রসুনের গুণমান বজায় রাখতে মাঠেই ডেরা বেঁধেছেন। এমনকি ফসলের সুরক্ষায় জমির এক কোণে ছোট কুঁড়ে ঘর বানিয়ে রাত কাটাচ্ছেন অনেকে।
করিমপুর সংলগ্ন গোয়াস, রহমতপুর ও বারবাকপুর এলাকা উন্নতমানের রসুন উৎপাদনের জন্য রাজ্যজুড়ে সমাদৃত। এবছর ফলন সন্তোষজনক হলেও চাষি ও ব্যবসায়ীদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে বাজারদরের অনিশ্চয়তা। বিগত কয়েক বছরের বাজারের খামখেয়ালিপনাই এর মূল কারণ। কৃষকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে রসুনের বাজার ছিল অত্যন্ত মন্দা। কুইন্টাল প্রতি দাম ৩ হাজার থেকে ৬ হাজার টাকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকায় মাথায় হাত পড়েছিল চাষিদের। অনেক ব্যবসায়ীকে লোকসানের মুখ দেখতে হয়েছিল।
তবে ঠিক তার আগের বছরের (২০২৪) স্মৃতি এখনও টাটকা নদিয়ার কৃষিজীবী মানুষের মনে। সেই সময় রসুনের বাজারদর আকাশছোঁয়া হয়ে কুইন্টাল প্রতি প্রায় ২৮ থেকে ৩০ হাজার টাকায় পৌঁছেছিল। সেবার যারা রসুন মজুত করেছিলেন, তাঁরা রাতারাতি বিপুল মুনাফা অর্জন করেছিলেন। সেই একই ‘জ্যাকপট’ পাওয়ার আশায় এবারও কোমর বেঁধে নেমেছেন করিমপুরের ব্যবসায়ীরা। কাঁচা রসুনের বদলে ভালো করে শুকিয়ে তা সংরক্ষণ করতে পারলে ভবিষ্যতে চড়া দামে বিক্রির সম্ভাবনা থাকে। আর সেই লক্ষ্যেই চলছে দিনরাত এক করে রসুন পরিচর্যার কাজ।
স্থানীয় চাষি ও ব্যবসায়ী শম্ভু ঘোষ বলেন, “রসুন চাষে লাভের গুড় সবসময় ঘরে ওঠে না। গত বছর আমরা লোকসান করেছি। কিন্তু তার আগের বছরের বাম্পার দাম আমাদের নতুন করে স্বপ্ন দেখাচ্ছে। এবার রোদ খুব ভালো উঠেছে, তাই রসুন শুকনোর কাজটা তাড়াতাড়ি হচ্ছে। আশা করছি বাজারদর এবার আমাদের নিরাশ করবে না।”
বর্তমানে করিমপুরের গ্রামগুলিতে উৎসবের মেজাজ। একদিকে প্রখর রোদকে আশীর্বাদ মেনে রসুন শুকনোর কাজ, অন্যদিকে চাতক পাখির মতো বাজারের দিকে চেয়ে থাকা—সব মিলিয়ে এক অস্থির কিন্তু আশাবাদী আবহাওয়া বিরাজ করছে নদিয়ার এই জনপদগুলিতে। কৃষি বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, যদি বহিঃরাজ্যে রসুনের চাহিদা বৃদ্ধি পায়, তবে নদিয়ার এই ‘সাদা সোনা’ ব্যবসায়ীদের পকেটে ফের লক্ষ্মী ফিরিয়ে আনতে পারে।





