পাকিস্তানের নিরাপত্তা পরিস্থিতি বর্তমানে চরম সংকটের মুখে। পাকিস্তান ইনস্টিটিউট ফর কনফ্লিক্ট অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজ (পিআইসিএসএস)-এর সাম্প্রতিক এক ভয়াবহ প্রতিবেদন অনুযায়ী, সন্ত্রাসীরা পাকিস্তানে এখন প্রতিদিন গড়ে দুই জনেরও বেশি সেনাসদস্যকে হত্যা করছে। শুধুমাত্র মে মাসেই ৬৬ জন সেনাসদস্য প্রাণ হারিয়েছেন এবং ৩৭ জন আহত হয়েছেন। এই পরিসংখ্যান দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থার ভঙ্গুর দশা এবং সেনাপ্রধান আসিম মুনিরের কঠোর অবস্থানের অকার্যকারিতাকেই সামনে নিয়ে এসেছে।
প্রতিবেদনটি এমন এক সময়ে প্রকাশ পেয়েছে, যখন সেনাবাহিনী সন্ত্রাসীদের সমূলে উৎপাটনের বড় বড় দাবি করছে। পিআইসিএসএস-এর তথ্য বলছে, মার্চ ও এপ্রিল মাস কিছুটা শান্ত থাকলেও মে মাসে সন্ত্রাসীরা নতুন করে ভয়াবহ তাণ্ডব শুরু করেছে। এই এক মাসে পাকিস্তানজুড়ে মোট ১২৮টি সন্ত্রাসী হামলা নথিভুক্ত হয়েছে, যার মধ্যে চারটিই আত্মঘাতী বোমা হামলা। মে মাসে সন্ত্রাসীদের হাতে ৭১ জন সাধারণ নাগরিকও নিহত হয়েছেন, যা সাধারণ মানুষের আতঙ্ককে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
সন্ত্রাস কবলিত প্রদেশগুলোর মধ্যে বেলুচিস্তান এখন কার্যত মৃত্যুর উপত্যকায় পরিণত হয়েছে। মে মাসে বেলুচিস্তানে ৭১টি সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা ঘটেছে, যা এপ্রিলে ছিল মাত্র ৩৪টি। অর্থাৎ, মাত্র এক মাসের ব্যবধানে হামলার হার ১০৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। অপহণের ক্ষেত্রেও বেলুচিস্তান শীর্ষে রয়েছে। মে মাসে দেশজুড়ে মোট ৫৪টি অপহরণের ঘটনা ঘটেছে, যার মধ্যে ৫২টিই ঘটেছে বেলুচিস্তানে। এই পরিসংখ্যান ইঙ্গিত দেয় যে, প্রদেশটিতে সরকারি নিয়ন্ত্রণ প্রায় শিথিল হয়ে পড়েছে।
এদিকে, পাকিস্তানি সেনাবাহিনী পাল্টা আঘাতের দাবিও করেছে। পিআইসিএসএস-এর রেকর্ড অনুযায়ী, নিরাপত্তা বাহিনী মে মাসে ২৭০ জন সন্ত্রাসীকে খতম করেছে এবং ১৫ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। সাবেক ফাটা (FATA) অঞ্চলে সবচেয়ে বেশি ১২৮ জন সন্ত্রাসী নিহত হয়েছে। এছাড়া খাইবার পাখতুনখোয়ায় ৬২ জন এবং বেলুচিস্তানে ৭১ জন সন্ত্রাসী নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে প্রাণ হারিয়েছে।
পাকিস্তানে বর্তমানে তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি), বেলুচিস্তান লিবারেশন আর্মি (বিএলএ) এবং আল-কায়েদার মতো বিপজ্জনক সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর সক্রিয়তা চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। সেনাপ্রধান আসিম মুনির বারবার দেশ থেকে এই গোষ্ঠীগুলোকে নির্মূল করার ঘোষণা দিলেও, প্রকৃত পরিস্থিতি ভিন্ন কথা বলছে। একদিকে সেনাবাহিনীর পাল্টা অভিযান, অন্যদিকে সন্ত্রাসীদের ক্রমবর্ধমান সহিংসতা—এই দ্বিমুখী লড়াইয়ে পাকিস্তান এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা এখন তলানিতে, আর রাজনৈতিক অস্থিরতার সুযোগ নিয়ে সন্ত্রাসীরা তাদের শক্তি প্রতিনিয়ত বাড়িয়েই চলেছে।





