রং তুলিতে জীবনের রং বদল, লকডাউনে শুরু, আজ শাড়ি-পাঞ্জাবিতে নকশা এঁকে স্বাবলম্বী বীরভূমের অনিতা

জীবনের মোড় ঘোরাতে কখনও কখনও প্রয়োজন শুধু একটুখানি সাহস আর আত্মবিশ্বাস। বীরভূমের খয়রাশোল ব্লকের বড়রা গ্রামের শিল্পী অনিতা রুইদাস সেই উদাহরণই তৈরি করেছেন। কয়েক বছর আগে শখের বসে শুরু করা ছবি আঁকা আজ তাঁর রোজগারের রাস্তা, তাঁর আত্মনির্ভরতার চাবিকাঠি।

ছোট থেকেই আঁকার প্রতি ভালোবাসলেও, ২০২০ সালের লকডাউনের সময় তাঁর জীবনের মোড় ঘুরে যায়। সোশ্যাল মিডিয়ায় হ্যান্ড-পেইন্টেড ডিজাইনের কাজ দেখে তিনি নিজেই প্রথম একটি ব্লাউজে নকশা আঁকার চেষ্টা করেন। সেই শুরু, এরপর আর ফিরে তাকাতে হয়নি।

গ্রামের গণ্ডি পেরিয়ে জাতীয় স্তরে অনিতার কাজ
প্রথমেই গ্রামের এক যুবকের অনুরোধে গেঞ্জিতে ডিজাইন করার পর তাঁর কাজের প্রশংসা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। দুর্গাপুজোর সময় তিনটি অর্ডার পান, আর সেখান থেকেই শুরু হয় তাঁর সাফল্যের গল্প। আজ অনিতা শুধু নিজেই স্বনির্ভর হননি, তিনি আরও পাঁচজনকে কাজ শেখাচ্ছেন, তাঁদের হাতেও তুলে দিচ্ছেন স্বনির্ভরতার চাবিকাঠি।

তিনি বলেন, “প্রথমে ভাবিনি এতদূর এগোব। কিন্তু খারাপ সময়টাই আমাকে এগিয়ে যেতে শিখিয়েছে।”

বর্তমানে অনিতার কাজের পরিধি বেশ বড়:

পোশাক: শাড়ি, ব্লাউজ, পাঞ্জাবি, কুর্তি, বাচ্চাদের ফ্রক, ধুতি-পাঞ্জাবি সেট, লেহেঙ্গা—সব কিছুতেই তিনি হাতের আঁকা নকশা করেন।

অন্যান্য কাজ: বিয়ের সামগ্রী, মণ্ডপের আলপনা, মেহেন্দি ও ওয়াল পেন্টিং-এর কাজও সমান দক্ষতায় করেন।

ব্যবসার কৌশল: সোশ্যাল মিডিয়া থেকে দেশ-বিদেশে ডেলিভারি
অনিতার কাজের স্টার্টিং প্রাইস ৭০০ টাকা, যা নকশার ঘনত্ব ও কাপড়ের মান অনুযায়ী বাড়ে। বড়দের পোশাকের দাম নকশা অনুযায়ী ৮০০ টাকা থেকে শুরু হয়ে ২০০০ থেকে ৫০০০ টাকায় পৌঁছায়।

অনিতা জানান, তিনি কাপড় কেনা থেকে শুরু করে রং, ডেলিভারি—সবকিছু নিজে পরিচালনা করেন। তাঁর হিসাবে, একেকটা পাঞ্জাবিতে প্রায় ৫০০-৬০০ টাকার লাভ থাকে। কিন্তু এই কাজের আসল আনন্দ টাকা নয়, মানুষের মুখে তাঁর কাজের প্রশংসা শোনা।

তাঁর ব্যবসার মূল ভিত্তি হলো সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম। মানুষজন তাঁর পোস্ট দেখে মেসেঞ্জারে যোগাযোগ করেন, অনলাইন অ্যাডভান্স পেমেন্ট করেন এবং তারপর কাজ শেষ হলে তিনি পোস্ট অফিসের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ডেলিভারি করেন। আজ বোলপুর-শান্তিনিকেতনের সোনাঝুরি হাটে-ও তাঁর তৈরি পোশাক বিক্রি হচ্ছে। শুধু দেশেই নয়, তাঁর সৃজন বিদেশেও পৌঁছেছে।

অনিতা এখন আর বাবা-মায়ের ওপর নির্ভর করেন না। নিজের সমস্ত খরচ নিজেই চালাতে পারেন। তাঁর স্বপ্ন, আগামী দিনে তাঁর এই হাতের কাজকে আরও বড় জায়গায় পৌঁছে দেওয়া।